জল – দেবরাজ দত্ত

চৌকিতে চেরাবাঁশের মত ঘাড়খানা ঘোরাতে গিয়ে কি এক অদ্ভুদ শব্দে ঘুমটা ভেঙে গেল। ধড়মড়িয়ে টালখাওয়া চৌকিতে উঠে বসল শম্ভু। সর্বনাশ! দরজার সরু ফাঁক দিয়ে চড়চড় করে অনেকটা যেন আপনমনে ঢুকে চলেছে জল আর জলের সাথে লেপ্টে আছে ভোরের করুণ আলো।

শম্ভু মাথার কাছ থেকে দেশলাই নিয়ে ফস করে জ্বালাল, জ্বলন্ত কাঠি হ্যারিকেনের নিস্তেজ সলতেতে ছোঁয়াতেই সমস্ত অলৌকিকতা ভেঙে পুরো ঘরটা চোখের সামনে ভেসে উঠল। লুঙ্গির গিটটা ভাল করে বেঁধে মেঝের দিকে ঘাড় বাড়াল সে। সেখানে এক বিঘত জল। মেঝেতে পা ফেলে অসতর্ক হাতে সশব্দে দরজা খুলল শম্ভু।

খটাস করে শব্দ হল।

“হায় ভগবান!”

শম্ভুর বাসিমুখ হা হয়ে গেল, চাপা আর্তনাদ আশ্বিনের সকালে ভাসতে লাগল। ভয়ার্ত দৃষ্টি ভোরের মৃদু আলোয় আঘাত হানল। দরজার কবাট খুলতেই আরও খানিকটা জল বিনা অনুমতিতেই ঘরের মধ্যে প্রবেশ করল। কবাটের ভাঙা তক্তা আঁকড়ে হতভম্বের মত দাড়িয়ে রইল।

চারিদিকে শুধু জল আর জল। যেন এক অজানা গভীরতায় ঘরবাড়ি গাছগাছালি নিজেদের অস্তিত্ব হারাতে বসেছে। বাইরে হাঁটু অব্দি জল। কিছুক্ষণের মধ্যেই হয়ত হাঁটু ছাড়িয়ে আরও ওপরে উঠে আসবে। সবকিছু নিজের বুকে ভাসিয়ে নেবার নেশায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।

জলের কাছে হার মানতে হয়েছে কতবার, কিন্তু সে সময় তর্জন গর্জন ছিল। কিন্তু আজ জলের এই চরিত্র শম্ভুর কাছে অধরা।

গ্রামের লোকেরা আর্তনাদ করছে, বাঁধের ওপর থেকে লুঙ্গি কাছা দিয়ে একদল লোক চিৎকার করতে করতে ছুটছে।

জল বাড়ছে, হাঁটু ছাড়িয়ে তরতর করে ওপরে উঠছে। শম্ভুর চেরাচ্যাপ্টা মাথায় অজস্র চিন্তা দানা বাঁধতে থাকে। ভোরের আলোর ওপর দিয়ে হাহাকারের আশঙ্কা গড়িয়ে যায়।

“লাশ লাশ” বলে কারা যেন চিৎকার করে উঠল। শম্ভু মজিদকে দেখতে পায়। মজিদ কোমর জল ডিঙিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল, “তোমাদের ওদিকে কি খবর শম্ভুদা?”

“খবর সব একই” মজিদের দিকে না তাকিয়েই শম্ভু উত্তর দিল।

মজিদ আধা সাঁতার কাটা অবস্থায় ছুটতে থাকে, কিছুদূর গিয়ে পেছনে ফিরে বলল “বৌদি আর মেয়েটার খবর নিয়েছো?”

শম্ভু ঘাড় নেড়ে “না” বলে।

“শিগগির দেখে আসগে তারা কেমন আছে?” বলেই মজিদ আবার ছুটতে শুরু করল।

বছর ঘুরে গেল। শম্ভু একাই থাকে। একদিন মাতাল হয়ে বউকে বেদম মেরেছিল, ব্লাউজ ছিঁড়ে পিঠে দাগ পড়ে গিয়েছিল। মেয়েটাকে নিয়ে বৌ পাশের গ্রামে ভাইদের কাছে চলে গিয়েছে। শম্ভু আনতে গেলেও ফেরেনি। মেয়েটাকেও দেখতে দেয়নি।

সামনে রেল লাইনটা ডুবে গেছে। সিগন্যাল বাতিটা বোকার মত দাঁড়িয়ে আছে। জল তো আর কোনও সিগন্যাল মানে না। মেয়েটার কথা কেন যে মনে করিয়ে দিল মজিদটা, শম্ভু দ্রুত পা চালায়।

পাশের গ্রামে ঢুকতেই বটগাছটার নীচে গা চোবানো কালী বিগ্রহ। জোর হাতে প্রণাম করল শম্ভু। এই গ্রামে জল কম। চলতে চলতে হঠাৎ থমকে গেল শম্ভু। সামনে একটা মেয়ে লাল ফিতে দিয়ে বিনুনি বেধেঁ দাঁড়িয়ে আছে। মনে তার অপেক্ষাতেই দাঁড়িয়ে আছে। একটু দূরে ঘরের চৌকাঠ ছুঁই ছুঁই জলের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে বউটা। মেয়েটা এক ছুটে এসে শম্ভুকে জড়িয়ে ধরে।

“বাবা, এবার পুজোতে আমারে একটা লাল জামা দেবে?”

মেয়ের প্রশ্ন শুনে শম্ভুর কাঁধে চেপে থাকা অদৃশ্য পাথরটা যেন নেমে গেল। চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া দু’ফোঁটা জল জমে থাকা থৈ থৈ জলের সাথে মিলিয়ে গেল।

দেবরাজ দত্ত

You may also like...

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.