অসম মন – সুস্মিতা দে হাজরা

শেষ বিকেলে সুন্দর একটা মায়াবি আলো থেকে যায়। বিকেলের দিকটায় বাড়ি থাকলেই ব্যালকনিটা আমাকে টানতে থাকে। ফিকে লাল রঙের আলো, আস্তে আস্তে হলুদ হতে হতে সন্ধের মুখে ধুসরের সাথে মিশে যায়। আবেগের রঙ গুলো অনেক ব্যবহারে শেষে যেমন ফিকে হয়ে যায় আরকি!

আমি তথাগত রায় আর তাত্ত্বিক আলোচনা আমার ধাতই নয়। কিন্তু ধাত না হলেও পাড় পাচ্ছি কই। আমার এখন যে প্রজেক্টটা নিয়ে কাজ করার কথা সেটার নাম ল্ভ ইন টুইলাইট। মানে কি গোধুলির প্রেম? এসব বোকা বোকা বিষয় নিয়ে কাজ করতে একমাত্র অর্কই পারে আর করছেও তাই। নাহলে অলউইন এর অ্যানুয়াল ফটো এক্সিবিশন এ আমাদের হাউসের থিম নাকি ল্ভ ইন টুইলাইট ! আমার কিছু করার ছিলো না। একজন সিনিয়র এডিটর ছাড়া আমি আর কে? তা সে অর্কর সাথে যত ভালো সম্পর্কই হোক না কেন। অর্ক চৌধুরি অ্যাবঅরিজিনাল নামে একটা ফিল্ম এডিটিং হাউসের মাথা আর আমার কেরিয়ারটা একসাথে শুরু হলেও আমি ওই টুকুই করে উঠতে পেরেছি। মানে ঐ সিনিয়র এডিটর পর্যন্ত। ভালো লাগেনা, এসব একদম ভালো লাগেনা। ভালো লাগে শুধু ছন্নছাড়া গতিময় জীবন। পাহাড়, সমুদ্র, জঙ্গল, আর কি চায় জীবনে? আর এই ইট, কঙ্ক্রিটের জীবনে আছেটা কি যে ভালো লাগবে। আছে অবশ্য, যার টানে বার বার এই বেবাগী ফিরে ফিরে আসে।

বাইরের দরজায় ডাক। কলিং বেল বাজছে। অবশ্য ভিতরের দরজা থেকে কবে বা ডাক এসেছিল। অনি এসেছে। অফিসে আমার জুনিয়র। অফিসের কাজে নয় অন্য দরকারে এসেছে। আজ যে অফ-ডে। আমার শেষ হিমাচল অভিযানের ছবি গুলো দেখবে বলে এসেছে। আমার ভক্তও বলা যায় ওকে আর কি!

ছবি গুলো দেখতে দেখতে অনি চোখ মুখের যা অভিব্যক্তি দিচ্ছে তাতে বোঝা যাচ্ছে আমার উপড় আজ ঝাঁপিয়ে পড়বে। অনেকদিন থেকেই পিছনে পড়েছে আমার কাছে কাজ শিখবে বলে। কে ওকে বোঝাবে সব কিছু শিখে হয়না, প্যাশন লাগে এই কাজে।

“তুই বোস্। বিয়ার আনি তোর জন্য”। অনি এবার নড়ে চড়ে বসলো। আমি জানি ও কি বলবে। আজ নিশ্চয় বান্ধবীর সাথে দেখা করার কথা। আজ ও অতি ভদ্রলোক। একখানা ক্যান এগিয়ে দিতেই না না করে উঠলো, কিন্তু আমিও আজ নাছোরবান্দা। আজ আমার দোসর লাগবেই মদ্যপানের। মনের দিঘিতে যে ছোট ছোট বুদবুদ উঠছে তাতে ভিতরের আগ্নেয়গিড়িটা জানান দিচ্ছে। অনির চেয়ে বাধ্য শ্রোতা কোথায় আর পাব আজ।

বিয়ারের ক্যানটা নিয়ে শুধুই নাড়াচাড়া করছিলো শেষে ধমক খেয়ে ক্যানটা ভাঙলো। “বৌদি নেই?” অনির কৌতুহলি চোখ আমাতে স্থির । “নাহ্, সুনয়না দেবী সপিং এ গেছেন। “ছদ্মরাগ দেখিয়ে অনি এবার বিয়ারের ক্যানটা টেবিলে রেখেই দিল। মানে আমার সঙ্গ আজ ও কোনমতেই দেবে না। “ বৌদিকে কেন যে তুমি এভাবে বল? আর বৌদি নেই মানেই তোমার অবাধ পানের স্বাধীনতা জন্মায় না।“ কথাগুলোতে যে খবরদারি ছিল তাতে রাগে গা জ্বালা করলো।

সুনয়নাও অনেক সময় আমার অবাধ পানের স্বাধীনতার উপড় সন্দেহ প্রকাশ করে। কিন্তু সেটা অন্য প্রসঙ্গ। সম্পর্কের যেটুকু উষ্ণতা এই মদ্যপানকেই একেবারে নির্মূল করে ফেলতে পারে আমাদের সম্পর্কে তার কোন রেশই নেই।কিন্তু অনি তো আমার সুভাকাঙ্খীই হতে চাইছে কারণ বিয়ারের তৃতীয় ক্যানটা আমার হাতে নিশ্বেষিত। রাগটা তাই এখন একদম বারবাড়ন্ত। শুকনো মরুময় জীবনে একফোঁটা জল শুধু অভিমানই বাড়ায়। “জ্ঞান দিস্ না অনি”।

চড়া গলার আওয়াজে অনিও খানিক চমকালো। আমার মনে পড়লো আমাকে জোড়ে কথা বলতে ও কোনদিন দেখেনি। আবহাওয়া ঠান্ডা করতে প্রসঙ্গও হালকা করতে হয়। অনির হাতে ক্যান তুলে দিতে গিয়ে বললাম কেন আমার স্ত্রীর নাম সুনয়না দেবী নয় কি? বাধ্য ছেলের মতো মাথা নিচু করা হাসিতে অনি এবার ক্যানে চুমুক দিলো। “তুমি পারও তথা দা”। বুঝলাম কারোর কারোর জীবন এখনও ততটা সরল আছে যে ছন্দ মিললেই কবিতা বলে ধরে নেয়! ভাব মিললো কিনা সে খেয়াল করে না। অবশ্য দু-চারটে অফিস পার্টি ছাড়া অনি আর আমাদের একসাথে দেখেছে কবে। আর তখনও তো সুনয়নার চোখ ধাঁধানো রুপ ছাড়া বাকি সব অপ্রয়জনীয় হয়ে গেছে নিশ্চয়। এবারের প্রজেক্ট-এর কাজ একটুও এগোচ্ছে না। কিন্তু মন বলছে এমনি করেই যায় যদি দিন যাকনা! অতয়ব অনিরই মাথা খাওয়া যাক্।

অনেক রাতে সেদিন অনি বাড়ি ফিরেছিলো। ওর বান্ধবী ফোন করে করে বিরক্ত হয়ে গিয়েছিলো। অনিকে শুধু বসিয়ে রাখা যেত একটা লোভ দিয়েই। আমার আগের বেশ কয়েকটা অভিযানের এর ফটো অ্যালবাম আর আমার সব কটা ক্যামেরা বার করে সারাটা সন্ধ্যা কাটিয়েও যখন রাত এগারোটায় সুনয়না ফিরলো না, ততক্ষনে অনির উৎসাহে ভাঁটা পড়েছে।

অনেক রাতে সুনয়না ফিরলো। অভ্যাসবসত জেগেই ছিলাম। ওর হাতের চুড়ির রিনঝিন আওয়াজ, ভারী পারফিউমের গন্ধ, সব মিলিয়ে আমাকে আরো অসহায় করে তোলে। আজ পর্যন্ত কোনদিনও আমি ওকে কোন কাজে বাঁধা দিইনি, কেন এত রাত হল? এ প্রশ্ন করতে আমার বিবেকে বাঁধবে, তবুও আমি জেগে থাকবো, ওর জন্য দুশ্চিন্তা করবো। জানি ও নিজে যথেষ্ট সচেতন নিজের নিরাপত্তার ব্যাপারে তাও আমার ঘুম আসবে না, মদ্যপানের প্রভাবও আমার স্নায়ুগুলোকে অবচেতনের মুক্তি দেবে না। এ বড় জ্বালা, ভালোবাসার জ্বালা। মনে মনে আজও আমি সেই আর্ট গ্যালারির করিডোরে দেখা সুনয়নার প্রেমে পাগল। আজও আমি নিজের অভিব্যাক্তি গুলোকে জাহির করতে পারিনা ঠিক সেদিন যেমন পারতাম না। সু এগিয়ে না এলে আমি তো কোনও দিনও বলে উঠতে পারতাম না ভালোবাসি তোমাকে। অথচ কত সহজে সু সেদিন পড়ে ফেলেছিল আমার মনটাকে। আজ কেন পারে না। আমাদের দুজনার মধ্যেকার এই নিশ্ছিদ্র সচ্ছ পাঁচিল পেড়িয়ে সেদিনকার মতই তো বলে উঠতে পারে, “ ভালোবাসো তো আমাকে, বললেই হয়”। একসাথে ব্রেকফাস্টের টেবিলে বসে একে অপরের সাথে একটাও কথা না বলে কাটিয়ে দিচ্ছি কতগুলো দিন সে হিসাব তো আর করি না। কবে থেকে এতটা অসংবেদনশীল হয়ে গেল সু। আমি তো সেই আমিই রয়ে গেলাম কিন্তু সু বদলে গেল।

অর্কটা জ্বালিয়ে খাচ্ছে। ফাইনাল প্রেজেন্টেশনটা দেখবে বলে আজ দুঘন্টা বেশি অফিসে থেকে গেল। রোজ অথচ ছটায় অফিস ছাড়ে। এই প্রজেক্টটা নিয়ে কেন এত বাড়াবাড়ি করছে সে খবর অবশ্য আমি রাখি। এই এক্সিবিশনটা মূলত যার উদ্দ্যোগে তিনি প্রশাসনের উচ্চ পদে আছেন তদুপরি অর্কর হবু স্ত্রীর নিকট আত্মীয়। যা পারে করুক, যত পারে বোকা বোকা কাজ করুক, বৌকে খুশি করতে কিন্তু আমাকে না জড়ালেও পারতো। ছবিগুলো আমাকেই তুলতে হবে অন্য কাউকে পাঠালে হবেনা। ছবি তোলা আমার নেশা আর সেই সুযোগটা বেশ নিচ্ছে অর্ক। অগত্যা কাঁধে ক্যামেরা ঝুলিয়ে এদিক ওদিক ঘুরতে হয়েছে আমাকে। প্রেজেন্টেশনটা দেখে সবচেয়ে বারাবাড়িটা করে ফেলল অর্ক। একেবারে আমাকে জড়িয়ে ধরল। এমনিতে বাকী সব ছবিগুলো প্রকৃতির প্রেক্ষাপটে গোধুলির আলোর খেলা তুলে ধরলেও একটা ছবি দারুন উতরেছে। দুজন প্রেমিক-প্রেমিকা গোধুলি আলোয় পরস্পরকে নিবিড় ভাবে আলিঙ্গনবদ্ধ করেছে। এত ভালো ক্যানভাস আর পাইনি বলে ছবিটা তোলার লোভ সামলাতে পারিনি। অবশ্যই সেই যুগলের অজান্তেই কাজটা করতে হয়েছে, না হলে মার খেতে হত আরকি! সবারই খুব পছন্দ হয়েছে ছবিটা।

যাইহোক অলউইন-এর বার্ষিক ছবি প্রদর্শনী শুরু হল। অর্ক যথারীতি দিনরাত ওখানেই পড়ে আছে। ন্যাকামির একেবারে চুড়ান্ত। এর আগে কবে এইভাবে এক্সিবিশন অ্যাটেন্ড করেছে মনে পড়ছে না। ওই গোলেমালে বুড়ি ছুঁই গোছের ভাবে একবার হয়তো যেত। কিন্তু এবার একদম হত্যে দিয়ে পড়ে আছে। আসলে বান্ধবীকে খুশি করতে এতোটা পরিশ্রম করতে হচ্ছে। আর অফিস সামলাতে আমাকে গাধার খাটনি খাটতে হচ্ছে। আজ ফিরুক। কথা বলতেই হবে। এখন বুঝছি অর্ক কেন অর্ক, আর আমি কেন আমি! যার যেটুকু পাওয়ার তার বেশি তাকে দিলেই মুসকিল। ও বরং কাল থেকে অনয়া বক্সিকে দায়িত্ব দিয়ে যাক। এমনিতেই দায়িত্ব পাওয়ার জন্য সে তো মুখিয়েই‌ থাকে। মোটকথা কাল থেকে আমি আর পারব না।

অর্ক অফিস ঢুকলো আটটারও পরে। আর আমার কেবিনে ঢুকে যেটা করলো, তাতে আরেকটু হলে আমার হাতফাত চলে যেত। আবার আমাকে জড়িয়ে ধরলো। কোনরকমে নিজেকে ছাড়িয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “ হলোটা কি?” যা বললো তা এই যে, প্রদর্শনীতে আমার সবকটা ছবিই খুব নাম কিনেছে, কিন্তু ঐ বিশেষ একখানা ছবি তুমুল জনপ্রিয় মানে ঐ অস্তরাগে প্রেমিকযুগলের ছবি খানা।

অর্ক একখানা পার্টি দিচ্ছে। প্রদর্শনীর বিশেষ সাফল্যকে উদযাপন করতে। এর আগেও ও যতবার আমাকে নিয়ে বাড়াবাড়ি করেছে, মনে সবাইকে ডেকে আমি এই হাউসের রত্ন গোছের দেখনদারিটা করতে চেয়েছে, আমি সটান হিমালয়ের টিকিট কেটেছি। কিন্তু এবার ও অন্য ফন্দি আঁটলো। পার্টি কালকে, আর আজ ও বাড়ি এসে সু আর আমাকে নেমন্তন্ন করে গেলো। সু আজ বাড়িতেই ছিলো যখন অর্ক এসেছিলো।। আরো অবাক কান্ড যে সু কাল আমার সাথে যাবে বলে অর্ককে কথা দিয়েছে!

রোমান্টিক হওয়াটা আমার হয়তো ধাতই নয়। সুনয়নার মতো সুন্দরীর সাথে প্রেমবিবাহ সম্পন্ন হবার পরও এটাই সত্যি। কিন্তু তবুও আজ কেন আমার মন বলছে কাল সু ঐ পার্টিতে গেলে আমাদের ভাঙাঘর টায় আরেকবার সুখের পায়রা বসলেও বসতে পারে। যাইহোক শেষ পর্যন্ত যাওয়াটা হচ্ছে। স্বাধারণত স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে এমন একটা দেখনদারির পার্টিতে গেলে অন্তত একঘন্টা বাড়তি সময় হাতে রাখতে হয়। নাহলে অন্যান্য রমনীদের সামনে নিজেকে কালো বা গলার হারটা বেমানান লাগলে রাতে বাড়ি ফিরে সারা রাতের আপনার ঘুমটা চটকে যেতে পারে, এমনকি বিষয় পরদিন পর্যন্ত গড়াতে পারে। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে বিষয়টা ভিন্ন। সু গত একঘন্টা সোফাতে বসে ম্যাগাজিনের পর ম্যাগাজিন ওল্টাচ্ছে আর আমি শার্ট টাই কিচ্ছু খুঁজে পাচ্ছি না। আসলে সারা বছর কটা দিনই বা এগুলোর আমি খোঁজ রাখি? সন্ধ্যা আটটা বেজে গেলো অর্কর পার্টিতে পৌঁছাতে। অর্ক একদফা আমাকে বকাটকা দিয়ে সুনয়নাকে নিয়ে গেল অন্যান্যদের সাথে দেখা করাতে। আজ আমি শুধু পানীয় নিয়ে বসে থাকতে পারবো না কারণ সেটা বেমানান হবে। অবশ্য গত একঘন্টায় সু আমার এক দুবার ছাড়া খুব একটা কাছাকাছি আসে নি। আমার সাথে এসেছে এই না কত! এর বেশি আশা করার আমার ক্ষমতা নেই।

ঠিকঠাকই সব চলছিল। অনি এসে সব গোলমাল করে দিল। কোথা থেকে উড়ে এসে আমাকে আর সু কে একেবারে টেনে নিয়ে গেল প্রদর্শনীর ছবিগুলো যে ঘরে আছে সেখানে। চেঁচামেচি করে বাকীদেরও বগলবাবা করে সঙ্গে নিল। যে ছবিগুলো নিয়ে এত কান্ড সেগুলো আবার সবাই দেখবে। আর সু যেহেতু প্রদর্শনীতে যায়নি তাই ওকেই বলা হল মতামত দিতে। অনিটা একদম অর্কর দলে গিয়ে ভিড়েছে। ওর উন্নতি কে আঁটকায়।

আরেক দফা সবার আমাকে বিব্রত করার পালা। কেন যে এরা বোঝে না! আরে, যেটা হয়ে গেছে সেটাকে নিয়ে আদিখ্যেতা করার আর কি আছে। সবাই অবশ্য সু এর মতামতটাই জানতে চাইছে। অনি তো বলেই বসলো, “বৌদি এখন শুধু বলবে, আমরা শুনবো”। আমি মাথা নিচু করেই দাঁড়িয়ে ছিলাম সবার শেষে। কিন্তু আমারও সু এর মতামতটা জানতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু সু তো কিছুই বলছে না। শুধু একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ঐ ছবিটার দিকে। মানে সেই প্রেমিক যুগলের ছবিটার দিকে। এত তন্ময় হয়ে কি দেখছে ও? আমার তোলা ছবি আগেও তো দেখেছে। হ্যাঁ, ছবিটা ভালোই উতরেছে। কিন্তু সর্বৎকৃষ্ট বলা যায় না। ওর মনের ভাব জানার ইচ্ছাটা বাড়ছে। তাই বাকীদের পাশ কাটিয়ে ওর মুখটা দেখার জন্য এগোলাম। কিন্তু একি! কেন এমন বিষ্ফোরিত দৃষ্টিতে ছবিটা দেখছে সু। ওর চোখে এতো অবিশ্বাস কেন। আমিও তাকালাম ছবিটার দিকে । সামনে গঙ্গা নদী। তারই পাড়ে একটা বেঞ্চে বসে এই প্রেমিক যুগল। প্রেমিকার পরনে সাদা সালোয়ার আর সবুজ ওড়না। প্রেমিকের গোলাপি শার্ট। দুজনার চরাচর ভুলে তন্ময় হয়ে আছে দুজনাতে। সূর্য তখন ঠিক ওদের পিছনে ছিল তাই চেহারা বোঝা যাচ্ছে না। তাতে কি? ছবিটা সবমিলিয়ে এই পটভূমিতে দারুন উতরেছে এটা আমিও স্বীকার করছি। অদ্ভুত যে, এই ছবিটা দেখার পর থেকে সু একটাও কথা বলছে না। অনি দু-একবার চেষ্টা করলো কিন্তু সু-এর মেজাজ দেখে পালালো। আমার ও এবার অস্বস্তি হচ্ছে। কেন এমন করছে সু। অন্য সময় হলে আমি কাছে গিয়ে একবার জানতে অবশ্যই চাইতাম। কিন্তু ভাবগতিক আমার এবার ভালো ঠেকছে না। আামার অসহায়তা বেড়েই চলল। প্রায় বারোটায় আমরা বাড়ি ফিরলাম।

রাস্তায় সু একটাও কথা বলে নি। অন্যদিন হলে কথা চালানোর জন্য ও দু একটা কথা বলে থাকে। আজ আর সেটুকুও বলে নি। বাড়ি ফিরে শোবার ঘরের দরজা বন্ধ করে দিল সু। ওর পোষাক পরিবর্তন করতে কিছুটা সময় লাগবে তাই অগত্যা সোফাতেই নিজেকে এলিয়ে দিলাম। আরো খানিকটা রাত হয়ে গিয়েছিল। একটা শব্দে তন্দ্রা ভেঙে গেলো। তখনও আমি সোফাতেই এলিয়ে। সামনে সু। সাদা রাত্রিবাস পরেছে ও। সুন্দরী দুরকম হয় স্বাধারণত। চোখ জুড়ানো আর চোখ ধাঁধানো। কিন্তু আমি দেখেছি সু-এর এই দুটো রূপই আছে। যেমন এই একটু আগে সাদা সিফনের শাড়িতে যেমন চোখ জুড়ানো লাগছিল ওকে, এখন দেখো এই স্বাধারণ রাত্রিবাসেও কেমন চোখ ধাঁধানো লাগছে ওকে। আমি বোধহয় বিহ্বলই হয়ে পড়েছিলাম। সু-এর কথায় চমক ভাঙলো। ”এরকম কেন করলে তথাগত?” হিসহিস করে উঠলো সু-এর গলা! আমি আবার কি করলাম? কয়েকটা ছবি তুলেছিলাম। আর অর্কের আদিখ্যেতায় সেগুলোকে দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলাম, ব্যাস! না গেলেই হত। ভালো লাগেনি তো? আর যেও না। মনে মনে এতগুলো কথা বললাম আর মুখে শুধু বললাম, “কি?” সুনয়না এবার অস্থির হয়ে উঠলো। একটা নীচু টুল টেনে এনে আমার খুব কাছে বসলো। এত কাছে যে আমার আবার অসহায় লাগছে। মনে করতে পারলাম না শেষ কবে সু আমার এতোটা কাছে বসেছিলো। কিন্তু আজ যে ও বড্ড কঠোর হয়ে আছে। আজ অন্তত এই কাছে আসাটা আমার সুবিধাজনক লাগছে না। তাকিয়েই রইলাম সু-এর দিকে। বোঝার চেষ্টা করছি কেন এত কষ্ট পাচ্ছে ও? “বুঝতে পারছো না,” বলেই সু এক ঝটকায় ব্যালকনির দরজাটার দিকে এগিয়ে গেল।

দরজাটা খোলাই ছিল। খোলা দরজা দিয়ে আকাশের নিটোল চাঁদের অনেকখানিই দেখা যাচ্ছে। আজ কি তবে পূর্ণিমা? তাই মনে হয় আকাশটা ভেষে যাচ্ছে রুপালি আলোয়। একবার চট করে ক্যামেরাটা নিয়ে ছাদে গেলে কেমন হয়? চাঁদের আলোয় সদ্য স্নান করা রুপালি আকাশটার নীচে গভীর ঘুমে পুরো একটা শহর। একটা দুর্দান্ত ক্যানভাস আমাকে টানছে। আরে! এসব কি ভাবছি? সু কেন এতো রেগে আছে সেটাতো আগে জানতে হবে। চাঁদ ছেড়ে তাই চন্দ্রবদনীতে নজর দিলাম। সু তখনও বলে চলেছে, ”জানি অর্চিষ্মানের কথা তোমাকে আগেই জানানো উচিত ছিল আমার। তা বলে তুমি স্পায়িং করবে। আমাকে সামনাসামনি জিজ্ঞেস করতে পারতে।”

এসব কি বলছে সু? আমার সত্যিই বোধগম্য হচ্ছে না। কে অর্চিষ্মান? কোনও বন্ধু কি? তাহলেও আমি কেন স্পায়িং করতে যাবো? আমি তো ওকে কোনদিন জিজ্ঞাসাও করিনি ও কার সঙ্গে যাচ্ছে । আমার ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া মুখটা দেখে সু-এর হয়তো সম্বিত ফিরল। গলার আওয়াজ যতটা সম্ভব খাদে নামিয়ে সু যখন কথা বললো, তখন ওর গলাতে আর হিসহিস শব্দটা শোনার যাচ্ছে না, আমার ওকে আবার চোখ জুড়ানো সুন্দরী বলেই মনে হচ্ছে। সু-এর মনে হয় এই অদ্ভুত ক্ষমতাটা সত্যিই আছে। মানে একইসঙ্গে দুইভাবে প্রতিভাত হওয়ার। কি যে আবোল তাবোল ভাবছি! নাহ্! এইবার মন দিয়ে শুনতেই হবে সু কি বলতে চাইছে। অনেক্ষ্ণ পরে এবার আমি কথা বললাম, “তুমি কি বলছো আমি তো বুঝতে পারছি না।” ব্যালকনির দরজায় দাঁড়িয়েই আমার চোখে চোখ রাখলো সু। তারপর খোলা দরজার দিকে ঘুরে যা বললো তার সারমর্ম এই যে, গত এক বছর অর্চিষ্মানের সঙ্গে ও সম্পর্ক সুত্রে আবদ্ধ। আমাকে ও নিজেই জানাতো বিষয়টা, কিন্তু সেইজন্য আমার এই নাটকটা করার কোন দরকারই ছিলো না। সেদিন গঙ্গা পাড়ে আমি যদি ওদের দেখেও থাকি তবে সামনে এলাম না কেন। সু তাহলে আমাকে সেদিনই জানিয়ে দিত যে আমাদের এই সম্পর্কটার আর কোন ভবিষ্যৎ নেই। আমাদের এবার আলাদা হয়ে যাওয়াই ভালো। আমার সত্যিই অদ্ভুত লাগছে। এই পরিস্থিতিতে আমার প্রতিক্রিয়া ঠিক কি হওয়া উচিত অনেক চেষ্টা করেও আমি সেটা মনে করতে পারলাম না। আমার বরং বার বার মনে পরছে আমার শেষ হিমাচল অভিযানটার কথা। এরকম পূর্ণিমার চাঁদ আমি সেরাত্রেও পেয়েছিলাম। কি অদ্ভুত মায়াবি আলোয় সেদিন ভেষে যাচ্ছিলো বরফে মোড়া দিকদিগন্ত। আমার সেদিন খুব ইচ্ছা করছিলো ক্যাম্প ছেড়ে অনেক অনেক দুর চলে যাবার। কিসের টানে সেদিনের সেই ইচ্ছাটা বাকী রেখেছিলাম কে জানে? নাহ্! হিমালয় বোধহয় আমায় আবার ডাকছে। এবারের কাজকর্মগুলো মিটিয়ে আরো একবার বেড়িয়ে পড়বো তাহলে। আচ্ছা সু যদি ডিভোর্স চায় তাহলে মিউচুয়াল ডিভোর্সে কি খুব বেশি সময় লাগে? আহ্! আবার আমি ভুলভাল ভাবছি। এখনই কি এসব ভাবার সময় এসে গেছে না কি আমার আরেকটা শেষ চেষ্টা করা উচিত?

You may also like...

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.