আত্মজা – সুস্মিতা দে হাজরা

অফিস বেরনোর সময়টা প্রতিদিনই দেরী হয়ে যায়। প্রায় দৌড়ে গিয়ে ট্রেন ধরতে হয়। আর ঠিক সেই সময়টাতেই নতুন এক বিপত্তি জুটেছে। আমাদের নতুন ভাড়াটিয়া। এক বয়স্ক ভদ্রলোক আর ভদ্রমহিলা। কাকিমা রোজ গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকেন। আমি বেরোতে গেলেই ধরবেন। একথা সেকথায় আমার আরো দেরি করিয়ে দেন। একে বয়স্ক তারপর আবার নতুন এসেছেন। কিছু বলাও যায়না। আমি যতটা সম্ভব ভদ্রভাবে পাশ কাটানোর চেষ্টা করি। একদিন কথা বলতে বলতে আমার চিবুকটা ধরে তো একদৃষ্টে তাকিয়েই রইলেন। যেন কতকিছু খুঁজে চলেছেন আমার মুখে। এবার আমাকে বলে দিতেই হবে যে এই সময়টা আমাকে আঁটকালে দেরি হয়ে যায়। পরের দিন একেবারে মনস্থির করেই বেরোলাম আজ একদম স্পষ্টাস্পষ্টিই বলে দেব যা বলার। কিন্তু কিছু তো বলতেই পারলাম না উপরন্তু ওনার কথা শুনতে গিয়ে আরো কিছুটা দেরী হল। ভাগ্য ভালো আজ ট্রেন একটু লেট ছিল।

সারা দিন ওনার কথাগুলোই কানে বাজতে লাগল। “তুমি কি গত জন্মে আমার কেউ ছিলে? তাই এত চেনা লাগে?” “জানো আমার একটা মেয়ে ছিলো। এখন আমাদের সাথে আর সম্পর্ক রাখে না। অন্য জাতির ছেলেকে বিয়ে করলো, আর তোমার কাকু রেগে ওকে বাড়িতে ঢুকতে দিল না। সেই যে রাগ করে গেল, আর কোনদিন এলো না। আমি কত চেষ্টা করেছি যোগাযোগ করার। তা মেয়ে এত অভিমানী যে কিছুতেই জানতে দিতে চায় না, কোথায় আছে? কেমন আছে?”

“ তোমাকে দেখে তবে কেন এত আপন লাগে ? বিশ্বাস কর, আগে কিন্তু কাউকে কখনো এমন মনে হয়নি। তবে তোমাকে দেখে কেন আমার আবার স্নেহ জাগছে?”

সারাদিন কথাগুলো মাথায় ঘুরপাক খেলো। সন্ধ্যাবেলা আমার স্বামী অনিন্দ্যকে জানালাম সবকিছু। অনিন্দ্যও আমাকে বোঝালো আমি যেহেতু সদ্যই বাবাকে হারিয়েছি আর মা ও বহু পূর্বে চলে গেছেন তাই আমার মনে এই স্নেহ কাতরতা জাগছে। হয়তো ঠিকই বলছে অনিন্দ্য। আমি তাই বিষয়টা নিয়ে আর বেশি মাথা ঘামালাম না।

এইভাবেই কেটে যাচ্ছিল দিনগুলো। ওনার এটুকু স্নেহের অত্যাচার মেনেই নিয়েছিলাম। অফিসে রোজ একটু আগে বেরোনোরই চেষ্টা করি। জানি তো উনি আঁটকাবেন। আর শুধু একটু সময়ই তো। আর কি বা চেয়েছেন কবে আমার কাছে? যদি কোনদিন অফিস যেতে পারলাম না তো বার বার উপড়ের ব্যালকনির দিকে তাকাবেন সেই সময়টায়। আমি কাজের ফাঁকে ফাঁকে দেখতে পাই সেটা। চোখে ভালো দেখেনও না। তাই ব্যালকনিতে আমি দাঁড়ালে দেখতেই পান না।

চারপাশের সবকটা সম্পর্কে কোন না কোন স্বার্থ জড়িয়ে থাকে নিশ্চয়। শুধু এই সম্পর্কটার কোন সঠিক সমীকরণ নেই বলেই এত মধুর লাগে বোধহয়। ওনার এই আমাকে খুঁজে চলাটা আমাকে অন্তর থেকে তৃপ্ত করে।

আজ আমি সত্যিই ভীষণ ব্যস্ত। ট্রেন ধরার আগে লাইনের ধারে মাধবীর বাড়ি হয়ে যেতে হবে। তিনদিন হল মেয়েটা কাজে আসছে না। খবরও দেয়নি কিছু। অফিস ফেরতাও একগাদা কাজ আছে। বুকানের নতুন ক্লাসের বুক লিস্ট নিয়ে বেড়িয়েছি আজ। শাশুড়ি মার ওষুধ কিনতে আবার অফিস থেকে অনেকটা যেতে হয়। কিন্তু বেরোনোর সময় কাকিমাকে তো দেখতে পেলাম না। রোজ কথা বলাটা অভ্যাস হয়ে গেছে। কি হল কে জানে? সময়ও নেই একদম। নীচের তলার দরজার দিকে ঘুরে তাকিয়েও কারুর দেখা পেলাম না।

সারা দিন কাজের চাপে অন্য কোন কথা ভাবার সময়ই পাইনা। বিকেলে তিনটের দিকে ফোনটা এল। অচেনা নম্বর। কি ভেবে ধরলাম ফোনটা। নীচের তলার ভাড়াটিয়া কাকু। মনে হল হয়তো জল নেই ট্যাঙ্কে তাই ভুল করে আমাকে ফোন করেছেন। উপর তলায়  মাকে বললেই তো হত। কিন্তু না, ওনার গলাটা কেমন যেন শোনালো। বুকের ভিতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠলো। কাকিমার কিছু হল না তো?

“তুমি এখুনি একবার আসতে পারবে? তোমার কাকিমার অবস্থা ভালো নয়।”

পরের আধঘন্টা যে আমি ঠিক কি কি করেছি পরে ভাবলেও মনে করে উঠতে পারবো কিনা সন্দেহ! তখন আমি শুধু যতটা তাড়াতাড়ি সম্ভব ওনার কাছে পৌঁছাতে চাইছিলাম। চোখের সামনেটা ঝাপসা হয়েই যাচ্ছিল বারবার। প্রচন্ড উদ্বেগে আমি ঘেমে নেয়ে একসা হচ্ছিলাম। কেন এই বারবাড়ন্ত আবেগ, নিজেকে সেটা প্রশ্ন করার সময় পাইনি।

নীচের তলার ঘরে যখন ঢুকলাম সেখানে শুধু কাকু আর আমার শাশুড়ি মা উপস্থিত। কাকিমা বিছানায় শুয়ে। কথা বলার ক্ষমতা আছে বলে মনে হল না। শুনলাম ডাক্তার এসেছিলেন। বিশেষ কিছু আর করার নেই। কবে থেকে এতটা অসুস্থ উনি। আমাকে তো কখনো কিছু বলেন নি। শুধু ভালোবাসাই দিয়ে গেছেন। কষ্টগুলোর কথা বলেন নি কখনো। কাকিমা এত কথা বলেন আমার সাথে আর আজ একটাও কথা বলতে পারছেন না। কথা বলছে ওনার চোখ। সে চোখের করুন আর্জি আমি ফেরাই কি করে? মাথার পাশে যখন বসলাম তখনও একদৃষ্টে উনি আমার দিকে তাকিয়ে। মাথাটা কোলে তুলে আমি হাউ হাউ করে কেঁদে উঠলাম। আমি তাঁর কেউ নই। তবু যে আমি তার আত্মজা!

সুস্মিতা দে হাজরা

You may also like...

Leave a Reply

%d bloggers like this: