ব্যক্তিগত গদ্য – সুস্মিতা সাহা

ব্যক্তিগত গদ্য

“শর্তবিহীন ভালোবাসা”- কি সুন্দর মন কেমন করা একটা শব্দবন্ধ। বাংলা এবং ইংরেজি দুটো ভাষাতেই শুনতে বড় ভালো লাগে। সারা জীবন যেন শুধু এরই অপেক্ষা…এরই খোঁজ। যদি কোনোদিন কোথাও সত্যিই খুঁজে পেতাম শর্তবিহীন ভালোবাসা…আনকন্ডিশনাল লাভ…যেখানে নেই কোনো চাওয়া-পাওয়ার হিসেব।

কৈশোরকাল থেকেই ঘুমঘোরে স্বপ্ন আমাকে অনেক কিছু দিয়েছে…দিয়েছে অনেক প্রশ্নের উত্তর,ফিরিয়ে দিয়েছে হারিয়ে যাওয়া কবিতার লাইন, নূতন গল্পের প্লট…। এমন কি পরবর্তীকালে স্কুলে পড়ানোর সময় বহুবার আমি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরী করেছি স্বপ্নের মধ্যে। জাগ্রত অবস্থায় যেসব সত্যের মুখোমুখি দাঁড়ানোর সাহস আমার হয় না,স্বপ্নে আমি তাদের মোকাবিলা করেছি। আবার আমার স্বপ্ন আমাকে এমন অনেক প্রশ্নও করে…যার উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমি সত্যিকারের জেগে উঠি…

সেদিন মধ্যরাতে ঘুমের ভেতরে কে যেন আমাকে ধাক্কা দিয়ে বললো- “এই যে মেয়ে…এই যে তোমার জীবনভর এতো শর্তহীন ভালোবাসার খোঁজ…একবার নিজেকে প্রশ্ন করে দেখো তো- তুমি নিজে কি কখনও কারুকে বেসেছো এমন শর্তবিহীন ভালোবাসা? উপহার দিয়েছো কারুকে আনকন্ডিশনাল লাভ ? দাবিহীন, শর্তহীন, চাওয়া-পাওয়া বিরহিত…তেমন ভালোবাসা…

বাবা মা,ভাইবোন, বন্ধু, সন্তান, প্রিয়তম জীবনসাথী…সব সম্পর্কের মধ্যই থাকে না কি অল্প একটু স্বার্থের নীরব উপস্থিতি ?

হ্যাঁ, নিশ্চয় থাকে, সব সম্পর্কের মধ্যেই থাকে কিছু চাওয়া পাওয়ার হিসেব।আর সেই হিসেবের গড়মিলের জন্যই তো জীবন জুড়ে এতো মান অভিমান …সম্পর্কের দুঃখ,যন্ত্রণা…।

সত্যিই তো আমি নিজে কি কারুকে উপহার দিতে পেরেছি “শর্তবিহীন ভালোবাসা”?
কি সাংঘাতিক গভীর এক প্রশ্ন…নিজেকে যার সামনে বড় ক্ষুদ্র বলে মনে হয়। তবুও এই প্রশ্নটা যেন আমাকে দিনরাত তাড়া করে বেড়ায়…

আজ আমার ছোট্ট বন্ধু সাচির জীবনের বড় গুরুত্বপূর্ণ একটা দিন। চার বছরের সাচি আজ প্রথম ‘বড় স্কুলে’ যাবে। আমার বর্তমান জীবনে সাচিই আমার একমাত্র এবং প্রিয়বন্ধু। ওর বয়সের তুলনায় আমি আদ্যিকালের বদ্যিবুড়ি। তবুও আমাদের এই অসমবয়সী গভীর বন্ধুত্ব কোনো কিছুর বাঁধা মানেনি । সাচি মারাঠি ভাষায় কথা বলে, আমি বাংলা…তবুও দুজনের মনের কথা বুঝতে, ভালোবাসা-আদরের ভাষা বুঝতে আমাদের কোনোদিন অসুবিধা হয়নি। আর যখন আমাদের বন্ধুত্বের সূচনা হয়েছিল তখন তো সাচির মুখে বুলিই ফোটেনি।

সাচির হাত ধরে আমি আমার এই প্রবাসী প্রৌঢ় জীবনের নূতন মানে খুঁজে পেয়েছি…ওর চোখ দিয়ে আমি আবার নূতন করে আকাশের রং বদল দেখি। বহুকালের পুরোনো চাঁদ সূর্যকে এত অবাক করা নূতন লাগে সাচিরই জন্য। প্রতিদিন বিকেলে আমরা দুজন এক সাথে পার্কে বেড়াতে যাই…দোলনায় দুলি।

কৈশোরে ছাদের এক কোণে দাঁড়িয়ে গোধূলির আকাশ দেখার নেশা ছিলো আমার । গোধূলির রং যে এমন মায়াবী সুন্দর হয়…সেই স্মৃতি সাচিই আমাকে ফিরিয়ে দিলো। ঘাসের উপরে ঝরা পাতার মধ্যেও লুকিয়ে থাকে এতো রহস্য? পথের ধারের নুড়ি পাথরগুলোও যে কত দামি খেলনা, সে কথা তো ভুলেই গিয়েছিলাম।সাচি সব মনে পড়িয়ে দিলো…মারাঠি শিশু সাচি এখন মনের আনন্দে আমার সাথে এক থালায় মাছেরঝোল ভাত খায়…

সেই সাচি আজ প্রথমদিন যাবে বড় স্কুলে । বড় আনন্দের দিন আজ…আমাদের ছোট্ট সাচির বৃহত্তর জীবনে প্রবেশের দিন । তবুও কেন যে গতকাল সন্ধে থেকে মনটা কেমন করছে…বড় অস্থির লাগছে…সাচিকে সারাদিন কাছে পাওয়াটা কেমন যেন একটা অভ্যাস হয়ে গিয়েছে…স্কুলে চলে গেলে ওকে অনেকটা সময় কাছে পাবো না, বড্ড ফাঁকা…খালি খালি লাগবে , সেজন্যই হয়তো এই অস্থিরতা। তবে কি এই মন কেমন করাটা আসলে নিজেরই জন্য ? এই বন্ধুত্ব,এই স্নেহের মধ্যেও লুকিয়ে আছে ছোট্ট একটু স্বার্থের কাঁটা ? কে জানে…

সাচি যখন মাঝেমাঝে দিন কয়েকের জন্য ওর মামাবাড়িতে যায় ,ও র দাদু-ঠাকুমা একটু মুখভার করে থাকেন। হতে পারে সেটা আসলে শিশু নাতনিটিকে ছেড়ে থাকতে ওঁদের ভালো লাগে না, কষ্ট হয় -সেই কারণে। বিরক্তিটা ওঁরা প্রকাশ করতে পারেন কারণ ওদের সেই অধিকার আছে। হ্যাঁ, অধিকার …বংশের অধিকার, রক্তের অধিকার । আচ্ছা,দাদু নাতির সম্পর্কেও কি থেকে যাচ্ছে না একটু স্বার্থ গন্ধ ? পরম্পরা বজায় রাখা…প্রবাহমানতা বজায় রাখার স্বার্থ ? সত্যিই জানি না …

কিন্তু আমি তো শুধুই সাচির বন্ধু আন্টি। সাচি অন্য কোথাও গেলে আমারও ভালো লাগে না,মন কেমন করে …। কিন্তু আমার যে কোনো দাবি নেই…নেই কোনো অধিকার। সাচি যখন মামাবাড়ি যায়,মনখারাপটা মনের মধ্যে লুকিয়ে রেখে আমি দরজায় দাঁড়িয়ে ওকে টা টা বলি …

তথ্যপ্রযুক্তিতে কাজ করার সুবাদে সাচির বাবা মাকে যেকোনো সময় বিদেশে চলে যেতে হতে পারে। এই ধরণের আলোচনা ওদের বাড়িতে মাঝেমাঝেই হয়। কথাগুলো শুনলেই আমার বুকের ভেতরটা কেমন করে ওঠে। সাচিকে ছেড়ে আমি থাকবো কেমন করে ? আমার যে বড্ড কষ্ট হবে… শিশুটির সাথে আমার নেই কোনো রক্তের সম্পর্ক নেই …নেই কোনো অধিকার,কোনো দাবি…তবুও কেন এই বুক ফেটে যাওয়া ?

আমি চুপ করে বসে ভাবি…কত কথাই যে মনের মধ্যে ভেসে আসে…মনে পড়ে যায় রবি ঠাকুরের সেই “কাবুলিওয়ালা আর মিনি”র কথা…সেই খোঁখী ডাক…

আজ সাচির বড় স্কুলে যাওয়ার প্রথম দিন। আজ আমার আত্মজা ডিম্পির কথাও বড্ড মনে পড়ছে। ওর প্রথম স্কুলে যাওয়ার দিনটার কথা…। সে কত বছর আগেকার কথা। তার আগে একটা দিনও আমি আর আমার ছোট্ট সোনাটা আলাদা থাকিনি…এক মুহূর্তর জন্যও না। ওকে ঘিরেই ছিলো আমার সম্পূর্ণ জগত।সেই শিশু যাবে স্কুলে…একা। অনেকটা সময় থাকতে হবে মাকে ছেড়ে, মাকেও থাকতে হবে একা…সন্তানকে ছেড়ে…প্রথমবার।

একদিকে সন্তানের নূতন জীবনের প্রথম দিন। সারাটা দিন মনেমনে শুধু প্রার্থনা করছিলাম-“ডিম্পি যেন মানুষের মতো মানুষ হয়”….অন্যদিকে বড্ড মন কেমন করছিলো, কেমন যেন কান্না পাচ্ছিলো। বারবার মনে হচ্ছিলো- ছোট্ট বাচ্চাটা পারবে তো একলা একলা টিফিন খেতে ? ওয়াশরুমে যেতে ? যদি গলায় খাবার আটকে যায় ? যদি আমার জন্য মন কেমন করে ওর? যদি কাঁদে ? টীচার বকবে না তো ? ডিম্পির ছোট্ট বুকটার ভেতরে কোনো ভয়, অসহায়তা ছটফট করবে না তো ? না না তবুও মন শক্ত করতেই হয়…সন্তানকে তো বড় করতেই হবে। তৈরি করতে হবে মানুষের মতো মানুষ…সফল,সার্থক সন্তানই তো পিতামাতার ভবিষ্যৎ…বার্ধক্যের অসহায় দিনে তারাই তো সহায়,সম্বল…

আজ এতো বছরে পরে কেন যেন মনে হচ্ছে ‘সন্তান স্নেহে’র মধ্যেও লুকিয়ে থাকে বেশ কিছুটা চাওয়া পাওয়ার হিসেব। সন্তানের সাফল্য যেন আসলে পিতামাতার অভিভাবকত্বের সাফল্যের সামাজিক স্বীকৃতি। সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ তৈরী করার মধ্যে নিহিত তো থাকেই পিতামাতার ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার চিন্তা। কি জানি …সঠিক ভাবছি কি না …তবু ভাবনাগুলো যে মনের মধ্যে আসছেই…

কিন্তু এই যে সাচির আজ নূতন জীবন শুরু হচ্ছে , ওর জন্যও সারাদিন করছি প্রার্থনা…আবার ওর জন্যই বুকের ভেতরটা এমন হু হু করছে …বয়সের হিসেব করলে কুড়ি বছর পরের সফল সাচিকে আমি হয়তো…হয়তো কেন বাস্তবিকই দেখতে পাবো না। আগামী বছর সাচির নূতন ক্লাসে ওঠাটাই দেখবো কি না কে জানে ? আগামী পাঁচ বছর পরে সাচিরা কোথায় থাকবে…বা আমিই কোথায় থাকবো…তারই কোনো ঠিক নেই। অনেক বছর পরে যদি দেখা হয় , তখন হয়তো কাবুলিওয়ালার খোঁখীর মতোই …

তবুও ঠিক ডিম্পির মতোই সাচির জন্য এমন হচ্ছে কেন ? কেন গতকাল সন্ধে থেকে বারবার মনে হচ্ছে -“এতো ছোট্ট বাচ্চাটা সারাদিন স্কুলে ঠিকমতো থাকতে পারবে তো ? টিফিন খাবে ? গলায় আটকে যাবে না তো ? কেউ যদি ওকে ধাক্কা দেয় ? দুষ্টুমি করলে টীচার বকবে না তো ? সাচি ভয় পাবে না তো ?

সারাদিন শুধু ভাবছি আর ভাবছি…মন জুড়ে আমার পাড়ার এই ছোট্ট প্রতিবেশী বন্ধুটা। হ্যাঁ ,এটাই আমাদের একমাত্র সম্পর্ক ওর ওপরে আমার কোনো অধিকার নেই .দাবি নেই। নেই আত্মীয়তার কোনো বন্ধন…কোনো চাওয়া পাওয়া। তবুও ছোট্ট বন্ধুটার জন্য বুকের মধ্যে টনটন করছে যে একটুকরো ব্যথা ..সেই ব্যথার মধ্যে কি একেবারেই নেই “শর্তবিহীন ভালোবাসার” সুঘ্রাণ ?

সুস্মিতা সাহা

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.