পাখি তুই ফিরে আয় – প্রদীপ পাল

সবুজ রঙের আলোছায়াময় গাছ ঝিমলির বড় প্রিয়। ছোট্ট বাগানটায় রূপোর পাতের মতো চকচকে সূর্যের আলোতে তার চোখগুলো বেশ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, সেই আলোর ভেতর রংবেরঙের প্রজাপতি তাদের হালকা শরীর নিয়ে ভেসে চলেছে।

বৃষ্টিভেজা দুপুরে জলের টাপুর টুপুর নাচের তালে মনের ভেতরটা আনন্দে নেচে ওঠে। উদাসীন চোখ বাগানের আনাচে কানাচে ঘুরে চলে। টববন্দি গাছের পাতায় স্ফটিক স্বচ্ছ জল, ভবঘুরে পাখিদের ভিজে পালক, ভিজে মাটির নরম গন্ধে সহজিয়া বাউলের সুর ছুঁয়ে যায়। বাঁধভাঙা আনন্দের ঝড়ে হৃদয় অস্থির হয়ে ওঠে। কিন্তু ঝিমলি এইসব কথা তার মা, বাবা কিংবা ক্লাসের বন্ধুদের গুছিয়ে বলতে পারে না। চলে নিজের সঙ্গে নিজের কথা বলা।

সেদিনের সেই পাখিটার কথা আজও ভুলতে পারে না; হালকা সবুজ পালক, হলদে ঠোঁট, জলপাই রঙের মাথা। এক রবিবারে ঝিমলির বাবা সুবিমল বাবু বাজার থেকে ফিরে হাঁক দিল-

”ঝিমলি এই দ্যাখ, তোর জন্য কি এনেছি”

হাতের পেন্সিলটাকে কোনক্রমে টেবিলের ওপর রেখে ঝিমলি দৌড়ে গেল বাগানের মাঝখানে। বুকের মাঝে তখন অজানা আনন্দের মাদল বাজছিল, কি জানি বাবা কি এনেছে? বাবার মুখে চোখ জুড়ানো হাসি; হাতে ঝোলানো একটা ছোট্ট খাঁচা আর তার ভেতর সুন্দর মিষ্টি একটা পাখি। ঐ প্রথমদিন থেকেই পাখিটার সাথে তার এক সরল সখ্যতা গড়ে উঠেছিল। ঝিমলি খাঁচাসুদ্ধ পাখিটাকে আঁকড়ে ধরে রাখতে চাইত। নিজের থেকে আলাদা করতে চাইত না। নতুন বন্ধুটিকে পেয়ে লতানো গাছের মতো বাগানটার সাথেও তার নিবিড়তা বেড়ে গেছে।

বাগানটার একপাশে যেখানে উত্তরদিকের দেওয়াল, বাহারি ক্যাকটাসের ভীড় আর মলিন আবছায়া, সেখানে একটা সরু লোহার তারে পাখিটা খাঁচার ভেতর ঝুলতো। বিকেল বেলায় আরও চার পাঁচটা কোয়ার্টার্সের ছোট ছোট ছেলেমেয়ে এসে সেখানে ভিড় করত। সেইসময় ঝিমলি ঝরণার মতো উচ্ছল হয়ে উঠত। পাখিটাকে নিয়ে কত কথা কত গল্প ঘুরপাক খেতে থাকে।

ঝিমলির মায়ের মুখে এসব গল্প শুনে সুবিমল বাবু তৃপ্তির হাসি হাসতেন, আর বলতেন, ” তাহলে বোঝ, আমি মেয়ের জন্য কেমন সুন্দর এক বন্ধু এনে দিয়েছি”। প্রতিদিন ভোরবেলায়, যখন ঐ পাহাড়টার গায়ে জড়ো হওয়া সমস্ত রাতের অন্ধকার সবে ফিকে হতে শুরু করে, ঠিক তখনই সুবিমল বাবু সোজা বাগানে চলে আসতেন। গাছেদের সঙ্গে নিভৃতে কিছুটা সময় কাটানোর পর ঝিমলিকে ডাকতেন, ” ঝিমলি ওঠো, সকাল হয়ে গেছে, চারিদিকে কত রোদ্দুর “। ঝিমলি উঠে এসে বাবার পাশে এসে দাঁড়িয়ে থাকত। মা, ছোট্ট বারান্দার প্যাসেজের ভেতর থেকে পাখির খাঁচাটা হাতে করে নিয়ে এসে বাগানের মধ্যে বাঁধানো পুরনো ফাটল ধরা ছোট্ট সিমেন্টের বেদিটার ওপর রেখে দিতেন। সকালের নবীন আলোয় পালক ফুলিয়ে উলুক ঝুলুক দৃষ্টিতে  মিষ্টি সুরে পাখিটা ডেকে উঠত।

ঝিমলি পাখিটার একটা নাম দিয়েছে, বংশীবদন। বাগানভরা জ্যোৎস্নার খেলা, বংশীবদনের মিষ্টি ডাক, কাছে পিঠের গ্রাম থেকে ভেসে আসা মাদলের হালকা শব্দ। টেবিল ল্যাম্পের আলো ছাপিয়ে চাদের নিটোল আলো এসে ঝিমলির পড়ার টেবিলে ঢেউ খেলে যাওয়া। রূপকথার রাজপুত্তুরদের তেপান্তরের মাঠে ঘোড়া ছুটিয়ে চলা। ঝিমলির চোখে তখন শুধুই অনাবিল আনন্দের ছবি।

ঘড়িতে প্রায় এগারোটা বেজে দশ। চারিদিকে একটা ঝিম ধরানো নিস্তব্ধতা। বৃষ্টির একঘেয়েমি ঝিরঝির শব্দের আওয়াজ। দূরে মিলিয়ে যাওয়া ট্রেনের শব্দ। কয়েক পা হাঁটলেই কোয়ার্টার। আজ অফিস থেকে ফিরতে অনেক দেরি হয়ে গেছে।  সুবিমলবাবু তাড়াতাড়ি হাঁটার চেষ্টা করলেন।

মেরুন গেটটা পার হয়ে ভেতরে ঢুকতেই, প্যাসেজের শিক লাগানো দরজাটা খোলার শব্দ হল। ঝিমলির মা বোবার মত দাঁড়িয়ে আছে।

সুবিমলবাবুর উচ্চকিত প্রশ্ন, ” কি গো…কি হল? ঝিমলি ঠিক আছে তো?”

খাঁচাটার পাশে চোখ যেতেই দেখলেন ঝিমলি তার পাশেই দাড়িয়ে আছেন, সুবিমলবাবু দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেলেন। ঝিমলির দু চোখের কোল ছুঁয়ে শুধু জল।

বংশীবদন উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। চঞ্চল ডানা দুটো শক্ত হয়ে গেছে। হলুদ ঠোঁটটা ফাঁক হয়ে আছে। চোখ দুটো বোজা। পাশে ছোলার বাটি, ডাঁটি ভাঙা কাপের জল আর আধখাওয়া দুটো কাঁচালঙ্কা ঠিক যেন নিশ্চুপ এক শূন্যতার দৃশ্য। খসে পড়া দুটো অগোছালো ডানার পালক তাদের নিজেদের রঙ নিয়ে যেন বড়ই মায়াময়।

মায়ের বুকে মুখ লুকিয়ে তার সেই অশান্ত কান্না, কখন যেন শান্ত হয়ে গিয়েছিল। এখন ঝিমলি একা একা বাগানের ভেতর দিয়ে হেঁটে বেড়ায়। দূরে দাড়িয়ে থাকে পাহাড়টার গায়ে এক স্বপ্নের ছবি আঁকে। বিকেলের পড়ন্ত আলোয় সেজে ওঠা মায়াবী আকাশটার দিকে বিষন্ন মুখ তুলে তাকায়। পাঁজর ছুঁয়ে জেগে ওঠা পাঁচটি শব্দ তখন ঝিমলির মনে ঝড় তুলে বলে ওঠে ” পাখি তুই একবার ফিরে আয়”।

প্রদীপ পাল

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.