ম্যাজিকের মানুষ – পিনাকীরঞ্জন গুহ

ইদানিং মানুষের জীবন বড় ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাচ্ছে। কোনও কিছু দিয়েই আর তা সামাল দেওয়া যাচ্ছে না। সকালে চোখ খোলা থেকে রাতে চোখ বোজা পর্যন্ত হাজারো অস্থিরতা মানুষকে অজস্র টুকরো কাগজের মতো উড়িয়ে দিচ্ছে। মানুষের এই ভাসমান বায়বীয় অবস্থাটা কেবলই বাড়ছে।

চিরকাল পণ্ডিতজন বলে এসেছেন- বাপু একটু থিতু হও, অত উড়ে বেড়ানো ভালো নয়। অথবা সতর্কতা জারি করে বলতেন, ‘অতি বাড় বেড়ো না,  ঝড়ে পড়ে যাবে ‘। সঙ্গে এও বলতেন- ‘অতি ছোটো হোয়ো না, ছাগলে মুড়ে খাবে’। তা ঝড়েই পড়ুক আর ছাগলেই মুড়ে খাক, মানুষ দু’নৌকায় পা দিয়েই চলে। এটাই মানুষের চিরকালের চলা।

লোককবি সেই কবে গেয়েছিলেন ‘ পাগলা মনটারে তুই বাঁধ’, কিন্তু কে কার কথা শোনে? ইদানিং মানুষের ভাবখানা বড় আজব। যেন সে দুনিয়ার সব বোঝে। সব কিছু নিয়েই সে ঘণ্টাখানেক বক্তৃতা শোনায়। আপাতভাবে সে অতি চালাক ছাড়া কিছুই নয়। জীবনে শুধু বাহাদুরি করতেই শিখেছে। আদতে মনুষ্যত্বের কোনও ধারই ধারে না। আসলে এক্সিবিশন ম্যাচ খেলতেই সকলের অপার আগ্রহ। প্রতিদিনকার ঘাম ঝরানো লিগ খেলায় তার আর মন নেই। সেকারণেই ক্রিকেট দুনিয়াতেও ‘টি টুয়েন্টি’ বা ‘ওয়ান ডে’ ম্যাচের প্রাধান্য, টেস্ট খেলার নয়।

চারপাশে শিক্ষার জয়ডঙ্কা বাজছে। কিন্তু দিক্ষা ঘটছে কোথায়? আদিকালে জ্ঞানী ঋষিরা বলতেন, আমরা চলেছি ক্ষুরস্য ধারায়। অতএব খানিক জিরিয়ে নেওয়ার অবকাশ নেই । একটু জিরোলেই ভেতর থেকে কেউ বলে- ‘ …মাইলস টু গো বিফোর আই স্লিপ ‘।

রবীন্দ্রনাথ বলেছেন -‘নাই নাই, নাই যে সময় নাই নাই,  ভুবনের এক হাটে লও বোঝা,  শূন্য করি দাও অন্য হাটে’। এর অর্থ হচ্ছে চলতে চলতে শেখো শিখতে শিখতে চলো। কিন্তু মানুষ বড় চঞ্চল,  বড় অস্থির । সে প্রতি মুহূর্তে জাদুকর হতে পছন্দ করে । পরিশ্রম বা সাধনার জন্য মনোনিবেশ ছাড়াই শুধু চোখ ধাঁধানো ম্যাজিক দেখাতে চায়।

প্যারাবল্সের সেই প্রোডিগ্যাল সন্। বীজ ছড়ানোর সময় খেয়াল রাখতে হবে তা পাথরে পড়ছে না মাটিতে। দৌড়াবার সময় মনে রাখতে হবে, ঠিক পথ পেরোচ্ছি কিনা। বাঁশবনে যদি ডোম কানা হয়ে যায় তো তার পক্ষে ঠিক বাঁশটি সংগ্রহ করাই হবে না, কাজ তো দূর অস্ত ।

একদিকে মানুষ বুদ্ধিবলে গোটা দুনিয়ায় খবরদারি করছে। অন্যদিকে নরকের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কীটের মতো কেবলই সংকীর্ণতা আর স্বার্থপরতায় অষ্টপ্রহর খরচ করে ফেলছে। চায়ের পেয়ালায় অজস্র তুফান অথচ জীবনে শুধুই অস্বস্তিকর গুমোট।

এই সর্বজ্ঞ মানুষ এসব শুনে ‘জাহান্নমের আগুনে বসিয়া’ ‘পুষ্পের হাসি’ হাসবেন। এবং আলতো তুড়িতে সিগারেটের ছাই ঝেড়ে ফেলে বলবেন ‘ এই তো জীবন কালীদা’।

পিনাকীরঞ্জন গুহ

You may also like...

Leave a Reply

%d bloggers like this: