বাঙ্গালির গান্ধীবিরোধিতা- গান্ধীর সত্যের সঙ্গে বাঙালির সত্যের এবং গান্ধীর সুন্দরের সঙ্গে বাঙালির সুন্দরের অনেক দূরত্ব সত্বেও একটা নির্বিবাদ মতৈক্য পাওয়া গিয়েছে। আজকের দিনে অন্তত এইটে স্মরণ রাখা খুব জরুরি…

বাঙ্গালির গান্ধীবিরোধিতা

 

“ধানেতে লাগিলে গান্ধী ধান ছাড়খার,

দেশেতে লাগিলে গান্ধী দেশে হাহাকার।

সনাতন হিন্দুধর্ম নাশিবার তরে,

এসেছে বেনের বাচ্চা গান্ধী-রূপ ধরে

ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে, আমাদের শৈশবে, বর্ধমানের গ্রামাঞ্চলে এই ছড়া লোকমুখে শুনেছি। স্পষ্টতই, এই ছড়া উৎসে আরো পুরাতন। ছড়াকার দুঃখ করেছেন, গান্ধীপোকা যেমন ধানের ক্ষতিসাধক, গান্ধীজি তেমনই দেশের পক্ষে বিপজ্জনক।বানিয়াপুত্র গান্ধী সনাতন হিন্দুধর্মের পক্ষে সর্বনাশা বলে ছড়াকারের ধারণা।

সন্দেহ করি, দেশভাগের আগে-পরে যে সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা চতুর্দিকে দেখা গিয়েছিল, ওপরের ছড়াটি সেই উন্মাদনারই ফসল। একটু বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করতে হয়, বর্ধমান জেলা প্রত্যক্ষ দেশবিভাজনের শিকার না হওয়া সত্ত্বেও সেখানে এই জাতীয় ছড়া ছড়িয়েছিল। মনে থাকতে পারে দেশকে যে কোন মূল্যে ঐক্যবদ্ধ রাখার জন্যে চল্লিশের সেই দিনগুলোতে গান্ধীজি মুসলিম জনগোষ্ঠীর ভাবাবেগকে গ্রহণ করতে বহুদুর পর্যন্ত এগিয়েছিলেন।   

জিন্নাকে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে স্বীকার করে দেশকে অবিভক্ত রাখার প্রস্তাবও তিনি দিয়েছিলেন।তারপর যখন দেশভাগ হয়েই গেল তখনও তিনি সংকীর্ণ রাজনীতির উপরে উঠে পাকিস্তানকে তার প্রাপ্য বুঝিয়ে দেওয়ার দাবী তুললেন। জাতীয় কংগ্রেসের অধিকাংশ নেতা তখন সম্পত্তি ভাগবাঁটোয়ারার হিসেবনিকেশে ভারতকে জিতিয়ে এবং পাকিস্তানকে হারিয়ে দিতে ব্যস্ত। কেবল গান্ধী বললেন, অসম এবং অন্যায় বন্টন পাকিস্তানের মানুষকে চিরদিনের জন্য বিদ্বিষ্ট করে রাখবে। বরং ভারত উদার হয়ে নবজাত ভ্রাতৃপ্রতিম প্রতিবেশীকে প্রাপ্যের অধিক দিক, তাতেই মঙ্গল। যুদ্ধক্লান্ত পৃথিবীতে এবং দাঙ্গাবিধ্বস্ত ভারতীয় উপমহাদেশে সকলেই তখন নানাবিধ বন্টন-পুনর্বন্টনের খেলায় নিরত, ফলে গান্ধীর পরামর্শ কারো ভালো লাগে নি। পরে যে গান্ধীকে ঐতিহাসিকেরা হিন্দু-সাম্প্রদায়িক ধর্মীয় রাজনীতি করার জন্য মৃদুভাবে অভিযুক্ত করেছেন, সেই গান্ধীই জীবনের শেষপ্রান্তে এসে তাঁর স্বদেশ ও স্বধর্মের বহু লোকের কাছে ঘৃণার পাত্র হলেন। নাথুরাম গডসের গান্ধীহত্যা কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না, ভারতীয় রাজনীতির একটি বিশেষ উন্মত্ত ধারারই প্রতিফলন মাত্র। বাঙালিচিত্তেও কখনও কখনও বিদ্বেষ দেখা দিয়েছে, আমাদের ছড়াটি তার প্রমাণ। 



গান্ধী, রবীন্দ্রনাথ ও রেনেসাঁস

বাঙালির গান্ধী বিরোধিতার চেহারা সবসময় এতটা উন্মত্ত বা সংকীর্ণ ছিল না। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ভারতীয় রাজনীতিতে গান্ধীর অনুপ্রবেশের সময়, অথবা বিশের দশকে তার নাটকীয় উত্থানের সময়, বাঙালি বুদ্ধিজীবী গান্ধীকে অনেকটা বড় করে দেখেছেন। গ্রহণ-বর্জন, সমর্থন-বিরোধিতার একটা দোলাচলমানতার মধ্যে দিয়ে মেধাবী বাঙালি নেতৃত্ব তখন অনেক সময়ই গান্ধী আন্দোলনের ব্যাপারে বহুমাত্রিক সাড়া দিয়েছেন সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের সেই বিখ্যাত কবিতা সত্ত্বেও বাংলার অগ্রগণ্য সামাজিক চিন্তানায়কেরা সত্যিসত্যিই কিন্তু “গান্ধী মহারাজের শিষ্য ” হয়ে যান নি। সম্পর্কটা অনেক বেশী দান্দ্বিক ছিল।


গান্ধীকে গ্রহণ-বর্জন করার ব্যাপারে বাঙালির বৌদ্ধিক প্রতিক্রিয়ার শ্রেষ্ঠ প্রকাশ অবশ্যই দেখি রবীন্দ্রনাথে। গান্ধী আন্দোলনের একেবারে গোড়ার পর্বের লেখা ‘সত্যের আহ্বান’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ মহাত্মার প্রবেশের সম্পর্ণ পরিপ্রেক্ষিতটি ব্যাখ্যা করে বলেছেন-


“মহাত্মা তাঁর সত্যপ্রেমের দ্বারা ভারতের হৃদয় জয় করেছেন, সেখানে আমরা সকলেই তারঁ কাছে হার মানি। এই সত্যের শক্তিকে আমরা প্রত্যক্ষ করলুম এজন্য আজ আমরা কৃতার্থ…কংগ্রেস আমরা প্রতিদিন গড়তে পারি, প্রতিদিন ভাঙতে পারি, ভারতের প্রদেশে প্রদেশে ইংরেজি ভাষায় পলিটিক্যাল বক্তৃতা দিয়ে বেড়ানোও আমাদের সম্পর্ণ সাধ্যায়ত্ত, কিন্তু সত্যপ্রেমের যে সোনার কাঠিতে শত বৎসরের মুক্ত চিত্ত জেগে ওঠে সে তো আমাদের পাড়ার স্যাকরার দোকানে গড়াতে পারিনে।  যাঁর হাতে এই দুর্লভ জিনিস দেখলুম তাঁকে আমরা প্রণাম করি। “


কিন্তু মহাত্মাকে এভাবে অভিনন্দন জানিয়েই রবীন্দ্রনাথ এবার তাঁর সংশয়গুলিও প্রকাশ করলেন। তিনি বললেন-


“দেশের সকল শক্তির জাগরণেই দেশের জাগরণ এবং সেই সর্বতোভাবে জাগরণেই মুক্তি।  মহাত্মাজীর কন্ঠে বিধাতা ডাকবার শক্তি দিয়েছেন, কেননা তাঁর মধ্যে সত্য আছে, অতএব এই তো ছিল আমাদের শুভ অবসর।  কিন্তু তিনি ডাক দিলেন একটিমাত্র সংর্কীর্ণ ক্ষেত্রে। তিনি বললেন, কেবলমাত্র সকলে মিলে সুতো কাটো, কাপড় বোনো।…এই ডাক কি নবযুগের মহাসৃষ্টির ডাক।”

রবীন্দ্রনাথের মূল আপত্তি সুতো কাঁটায় নয়। তাঁর বক্তব্য- একটি সংকীর্ণ ক্ষেত্রে অল্প একটুখানি ব্যাপার নিয়ে জোর করে সারা দেশের মানুষের উপর তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি চাপিয়ে দিয়ে মহাত্মা মুক্তির মূল মন্ত্রের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করছেন। 

পশ্চিমের কলের দৌরাত্ম্যের বিরুদ্ধে তিনি লড়ুন, কিন্তু বাধ্যবাধকতার কাপড় পোড়ানোর আয়োজন অর্থনৈতিক বা নৈতিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়। বর্জননীতির পোষণপালনের মধ্য দিয়ে পরের অপরাধের কথা বারবার মনে পড়ানো যায়, কিন্তু আত্মশক্তির উদ্বোধন হয় না। সারা পৃথিবী জুড়ে সকলকে মিলিয়ে বিশ্বগত যে সামঞ্জস্যসাধনের সাধনা, মহাত্মা সেই সাধনা থেকে দেশের মানুষকে সরিয়ে আনছেন বলে রবীন্দ্রনাথের আক্ষেপ। সন্দেহ করিনা যে, রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধীর মতপার্থক্য অনেকাংশে ব্যাক্তিগত। রবীন্দ্রনাথ কবি,ভাবুক, একা।  গান্ধী কর্মী, আন্দোলনকারী ও নেতা। চরকার ওপর অকারণ গুরুত্ব কবিকে পীড়া দিয়েছে, গান্ধীর কাছে ওটা হয়ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। 


রবীন্দ্রনাথ যেটাকে মোহমুগ্ধ বাধ্যতা বলে ভাবছেন গান্ধীর কাছে ওটা শৃঙ্খলা। পরের অপরাধ স্মরণ করানোর পৌনঃপুনিকতা রবীন্দ্রনাথকে ক্লান্ত করে, গান্ধীর যুদ্ধে ওটা হয়ত অপরিহার্য কৌশল। রবীন্দ্রনাথ চাইছেন নবযুগের মহাসৃষ্টিতে সব কটি সুরের ঐকতান, গান্ধীর কাছে হয়ত আপাতত একতারাই অনেক। গান্ধী-রবীন্দ্রনাথের এই বিতর্ক ও পার্থক্য বারবার বেরিয়ে এসেছে। রবীন্দ্রনাথ যেখানে সুন্দরে জোর দিচ্ছেন, গান্ধী হয়ত সেখানে তাঁর নিজের মত করে সত্যে জোর দিতে চান। রবীন্দ্রনাথ বর্ণময়তা চাইছেন, গান্ধী সরলতা চাইছেন। রবীন্দ্রনাথ সৃষ্টি সুখের উল্লাস চাইছেন, গান্ধী শৃঙ্খলা উপহার দিচ্ছেন। একজনের আকাশ নক্ষত্রখচিত, বহুবর্ণ ও বৈভবময়। অন্যজনের আকাশ মেঘমুক্ত নীল। একজন জন্মমাত্র অমৃতের পুত্র, অন্যজন ক্রমশঃ তমসা থেকে জ্যোতির দিকে চলেছেন। পার্থক্য স্বাভাবিক। দিলীপকুমার রায়ের স্মৃতিচারণায় এই স্বভাবগত পার্থক্যের বর্ণনা আছে। 

তবু বলতে হয়, গান্ধী-রবীন্দ্রনাথ তর্কে সবটুকুই আবার ব্যাক্তিগত নয়। কিছু কিছু প্রশ্ন ক্ষেত্রগত এবং যুগগতও বটে। পূর্ব-পশ্চিমের শ্রেষ্ঠ সম্মিলনের ফসল বাংলার রেনেসাঁস। নাগরিক সম্পন্ন বাঙালি সেই নবজাগরণে তার চিত্তকে ঐশ্বর্যবান করেছে, নানা দিকে উদ্বুদ্ধ করেছে। সাহিত্যে, চিন্তায়, বিজ্ঞানে, শিল্পে এই নবজাগ্রত মনের গভীরতা স্পষ্ট। গান্ধীর আন্দোলন এই বহুমুখী উদ্বোধনের বিপরীত মেরুতে অবস্থিত। গান্ধী পোশাকে স্বেচ্ছায় দরিদ্র, বাক্য ব্যবহারে পরিকল্পিতভাবে সরল, উদ্দেশ্য নির্ধারণে নিপুণভাবে একমুখী এবং কৌশল নির্মিতিতে অবশ্যই প্রতীকপ্রন্থী। মেধাবী ভাবুকের চিত্তের বৈভবকে দৈনন্দিন ব্যবহারে স্বীকার করে নেওয়ার সময় গান্ধীর নেই, বরঞ্চ নাগরিক পরিশীলনের লক্ষণমাত্রও যাতে তাঁর বাহ্য অবয়বে না ফোটে সেইটা সুনিশ্চিত করাই তাঁর লক্ষ্য। রেনেসাঁসের বাঙালি পশ্চিমের আলোর উৎসের দিকে তাকাতে চায়, অসহোযোগের যোদ্ধা পূর্বের অন্ধকারের গভীরে প্রবেশ করে যায়। ইচ্ছায়, উপায়ে, কৌশলে, নির্মিতিতে ব্যবহারে, অব্যবহারে- সর্বত্রই যেন মেরুগত পার্থক্য। রবীন্দ্রনাথ এক বিশেষ সময়ের বিশেষ যুগের শেষদিকের শ্রেষ্ঠ সন্তান। গান্ধী অন্য এক বিশেষ সময়ের বিশেষ যুগের প্রথম দিকের শ্রেষ্ঠ সন্তান। রবীন্দ্রনাথ বাংলার রেনেসাঁস তার শেষ পর্বের ব্যাখ্যা দিচ্ছিলেন, গান্ধীতে ভারতের রাজনীতি তার নতুন পর্বের প্রথম সংজ্ঞা পাচ্ছিল। 


                                               

                                             গান্ধী ও মেট্রোপলিটন রাজনীতি 



মেট্রোপলিটন বাঙালির রেনেসাঁস-মনই যে কেবল গান্ধীর আবির্ভাবে কিছু পীড়িত বোধ করেছিল তা নয়। তার চেয়ে অনেক বড় বাস্তব কথা হল, মেট্রোপলিটন বাঙালির রাজনৈতিক চর্চায় গান্ধী একটী বড় ধাক্কা দিয়েছিলেন। এর একটা ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিত আছে। 

উনিশ শতকের শেষ দিকে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত-উচ্চমধ্যবিত্ত ভারতবাসীর আশা ও আশাভঙ্গকে কেন্দ্র করে যে প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতির সূচনা হয়, তার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল কলকাতা, বোম্বাই(অধুনা মুম্বই) ও মাদ্রাজ(অধুনা চেন্নাই)। এই তিন সমুদ্রতীরবর্তী প্রেসিডেন্সী শহরেই পশ্চিমের হঠাৎ আলোর ঝলকানি প্রথম এসে লেগেছিল, ইউরোপের শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক চিন্তাধারার সঙ্গেও এই তিন শহরেরই প্রথম পরিচয়। আবার শিক্ষিত বেকারের হতাশা বা চাকুরিজীবীর গ্লানি ও পেশাজবীর দ্বন্ধের সূত্রপাতও এই তিন শহরেই। স্বভাবতই, দরখাস্ত-আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে নিজেদের বৃত্তির সুযোগ বাড়িয়ে নেওয়ার রাজনীতিরও গোড়াপত্তন এইসব জায়গায়। কলকাতা-মুম্বই-চেন্নাই এই প্রথম যুগের রাজনীতিকরা কখনও মধ্যপন্থী, কখনও চরমপন্থী, কখনও নিজেদের সমাদের সংস্কারক, কখনও বা রক্ষণশীল, কখনও উন্নত রাজনৈতিক দর্শনে অনুপ্রাণিত, কখনও বা নিতান্তই সুযোগসন্ধানী। কিন্তু সাধারণ বিচারে এঁরা প্রায় সবসময়ই মহানাগরিক এবং মহানাগরিতার কল্যাণেই যেন সহজাত নেতা। গ্রামের তো নয়ই, এমনকি মফঃস্বল শহরের সমস্যাও তারা কার্যত বোঝেন না। কৃষক, শ্রমিকের তো নয়ই, এমনকি অল্পশিক্ষিত, নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের ভাষাও তাদের আয়ত্তের বাইরে। এঁরা ইংরেজীতে বক্তৃতা দেন (যার প্রতিবাদ করেছিলেন সয়ং রবীন্দ্রনাথ), জন স্টুয়ার্ট মিলের দর্শনে বিশ্বাস করেন, সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার সময়সীমা বাড়াতে বলেন এবং সংবাদপত্রে এডিটোরিয়াল লেখেন। এঁরা ঐতিহাসিকভাবে একসময় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। এবং এঁদের মধ্যে কয়েকজন অসাধারণ মনস্বী পুরুষ ছিলেন সত্য, কিন্তু বিশেষ করে শেষের দিকটার এঁদের রাজনীতির সীমাবদ্ধতটা ধরা পড়ছিল। 


 আসলে এই শেষের দিকে প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতির চরিত্রটাই দ্রুত বদলে যাচ্ছিল। একদিকে স্থানিক অর্থে, মেট্রোপলিটন শহরগুলির সীমানা ছাড়িয়ে জাতীয়তাবাদী রাজনীতি প্রবেশ করছিল গ্রামে-গঞ্জে-ছোট শহরগুলিতে এবং অন্যদিকে, ভিত্তিবিচারে রাজনীতির প্রকাশ্য অঙ্গনে ঢুকছিল নতুন নতুন শ্রেণী। উনিশ শতকের শেষ দিক থেকেই ট্রেড ইউনিয়ন বোর্ড, জোলা বোর্ড এবং পুরসভাগুলির মধ্য দিয়ে এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, মর্লে মিন্টো সংস্কার(1909) ও মন্টেগু চেমসফোর্ড সংস্কারের(1919) ফলে পরিধিটা বেড়ে যায়। ব্রিটিশ ভারতের জেলা ও মহকুমা শহরগুলির উদীয়মান মধ্যবিত্ত নেতৃত্বের সেি সময়কার চিত্তচাঞ্চল্যের কথা বাংলা সাহিত্যে ধরা আছে, তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা তো যে কোন সময় মনে পড়বে। পুর-রাজনীতির ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বার্থবন্ধনের বুনোট কীভাবে জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে পরিণত হচ্ছিল, এতিহাসিক অনিল শীল তাঁর বিখ্যাত গবেষণাপত্রে হদিশ দিয়েছেন। কেমব্রিজ স্কুলের আর এক পণ্ডিত জুডিথ ব্রাউনের মতে গান্ধী এই নিম্নতর স্তরের রাজনীতির সাবকন্ট্রাকটরদের গ্রন্থিবদ্ধ করেছিলেন। এঁদের মতামত অনুপুঙ্খ নিয়ে বিতর্কের অবকাশ আছে, কিন্তু গান্ধী যে মহানগরের রাজনীতির বাইরের পৃথিবীকে স্পর্শ করতে চেয়েছিলেন সেটা সন্দেহাতীত।


শ্রেণীবিচারে, দুটো বড় শ্রেণী তখন অধীর হয়ে উঠেছিল। একটা শ্রেণী শ্রেষ্ঠী সম্প্রদায়ের, আমেদাবাদের মিলগুলিকে কেন্দ্র করে যারা ক্রমেই গোটা দেশে ছড়িয়ে পড়ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সুযোগ নিয়ে এই নব্য বণিক সম্প্রদায় সামাজিক প্রভাব অর্জন করে নেয়, কিন্তু জাতীয়তাবাদী রাডনীতিতে এদের সংযুক্ত প্রক্রিয়াটা বাকি ছিল। মারাঠা ব্রাক্ষ্মণ তিলক, পঞ্জাবকেশরী লাজপত কিংবা বাংলার ইনলেকচুয়াল বিপিন পাল, অরবিন্দ ঘোষদের পক্ষে এই প্রক্রিয়াটা অনুধাবন করাই লম্ভব হয়নি। ঘনশ্যামদাস বিড়লা এবং যমুনালাল বাজাজদের মতো শ্রেষ্ঠীদের জন্য যে রাজনৈতিক দর্শনের দরকার ছিল তা তৈরী করলেন গান্ধী এবং মুহূর্তে বদলে গেল রাজনীতির চরিত্র। আবার সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে অন্য আরেকটি প্রভাবশালী শ্রেণী, ভারতের কৃষক সমাজ, ততদিনে অস্থির হয়ে উঠেছে। চম্পারণ থেকে গোরক্ষপুর হয়ে বরদৌলি পর্যন্ত বিস্তৃত এই বিপুল কৃষিজীবী মানুষ তখন স্বতঃস্ফূর্ত রাগে ফুঁসছে, জওহরলালের আত্মজীবনীতে সে ছবি আছে। এই মানুষগুলি যেন অর্ধনগ্ন, সর্বত্যাগী মহাত্মা অবতারের যাদুদণ্ডের অপেক্ষায় ছিল, গান্ধীর প্রতিমা তাদের চমৎকৃত করে দিল। নিম্নবর্গীয় এতিহাসিক শহীদ আমিন তাঁর সাম্প্রদায়িক এক লেখায় দেখিয়েছেন, গোরক্ষপুরের গ্রাম্য কৃষকেরা নিজেদের কল্পনায় গান্ধীর এক অলৌকিক চেহারা তৈরী করে নিয়েছিল। ইতিহাসের এক বিচিত্র সন্ধিক্ষণে নানা বিপরীতমুখী শ্রেণী ও সম্প্রদায় নানান কারণে গান্ধীকে আশ্রয় করল।


আবার শুধু এইটুকুই যেন যথেষ্ঠ ছিল না। গান্ধী রাজনীতিতে নামলেন তার দুই আলি ভাইকে নিয়ে। খিলাফত আন্দোলনের চরিত্র, ভঙ্গি ও যথার্থ্যতা নিয়ে বিশদ আলোচনা সম্ভব। কিন্তু আপাতত শুধু এটুকু বলা যায় যে, জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে এর আগে কখনও মুসলিম সমাজকে কেউ এতটা প্রাধান্য দেয়নি। তিলক যখন অওরংজেবের বিরুদ্ধে শিবাজীকে দাঁড় করিয়ে জাতীয়তাবীদী আন্দোলনকে একটা হিন্দু চরিত্র দিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই বাংলাদেশে আমরা প্রতাপাদিত্যকে নায়ক হিসেবে গড়ে তুলেছিলাম(ব্যতিক্রম রবীন্দ্রনাথ)। মুসলমানদের কথা আমাদের খেয়াল হয়নি, কারণ তারা সংখ্যালঘু, দ্বিতীয়ত, অন্তত বাংলাদেশে, তারা হিন্দু জমিদারদের নগণ্য প্রজামাত্র। গীতা ও রামরাজ্যের প্রতি সম্পূর্ণ মমত্ব নিয়েও গান্ধী অন্তত ছবিটা কিছুটা বদলে দিলেন। অস্পৃশ্যতা-বিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে যেমন স্বীকৃতি দিলেন তাঁর হরিজনদের।


গান্ধী আন্দোলনের সামাজিক-অর্থনৈতিক সারবস্তু বিচার করার ক্ষেত্র এটা নয়। বলবার কথা এই যে, জাতীয় রাজনীতির স্থানিক ও শ্রেণীগত ভিত্তিপ্রসারের ফলে মেট্রোপলিটন রাজনীতির পক্ষে আর নেতৃত্ব দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। নতুন ভাষা ও ভঙ্গি নিয়ে নতুন সূত্র বন্ধনের প্রয়োজন ছিল এবং গান্ধী এই ঐতিহাসিক প্রয়োজন মেটালেন। কলকাতা-মাদ্রাজ-বোম্বাইয়ের মরা খাতের পাশ দিয়ে গান্ধী নদীকে নতুন এক পথ দিয়ে নিয়ে গেলেন। দিল্লীতে রাজধানী স্থানান্তরের পরই কলকাতার প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক গৌরব অনেকাংশে অস্তমিত হয়েছিল। গান্ধীর আবির্ভাবে বাংলার লাঠির দিন চিরতরেই গেল। বাঙালি গান্ধী বিরোধী হবে বৈকি।


আরেকটা কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন। জাতীয় রাজনীতির স্থানিক ও শ্রেণীগত ভিত্তি বাড়িয়ে দিয়ে গান্ধী স্বাধীনতা আন্দোলনে জোয়ার এনেছিলেন একথা যেমন সত্য, কৌশল ও পদ্ধতি নির্ধারণেও তিনি যে তেমনই একটা নতুন ধাঁচের জেদ এনে দিয়েছিলেন, সেকথাও তেমনই সর্বজনবিদিত। যেটা সবসময় খেয়াল থাকে না সেটা হল, এই নতুন কৌশল ও পদ্ধতিগুলি প্রায় সর্বাংশেই মেট্রোপলিটন রাজনীতির প্রতিষ্ঠিত ধারার বিরোধী ছিল। গান্ধীর অসহযোগ ইংরেজের আদালতকে বর্জন করল এবংরেন্স সেইসঙ্গেই আঘাত করল মহানাগরিক ব্যারিস্টার রাজনীতিকের। গান্ধী সবসময়ের পেশাদারী রাজনৈতিক কর্মী চাইলেন, আহত হলেন বাবু শ্রেণীর কনফারেন্সওয়ালারা। গান্ধী খাদি ও চরাকাকে সর্বোচ্চ স্থান দিলেন, কোট-প্যান্টালুনের নাগরিকদের ওপর চোট পড়ল। মাওয়ের ‘সদর দফতরে কামান দাগো’ স্লোগান যেমন একদিকে বৃহৎ সংখ্যক মানুষের উদ্বোধনের ডাক, অন্যদিকে তেমনই উপদলীয় রাজনীতিতে নিজের প্রতিষ্ঠা স্থাপনের প্রচেষ্টা। গান্ধীর অসহযোগ-খাদি-চরকা-সাংগঠনিক শৃঙ্খলার জটিল ও বহুবিস্তৃত পদ্ধতি তেমনই একদিকে রাজনীতির নতুন জোয়ারকে সংহত করার প্রয়াস, অন্যদিকে পুরানো মহানাগরিক-সংসদীয়-বাবু উপদলটিকে সবদিক থেকে অপ্রতিভ করার ব্যবস্থা। একদা দক্ষিণ আফ্রিকায় এক রেলপথে অপমানিত হওয়ার ব্যক্তিগত অভিমানকে যিনি বৃহত্তম সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলনে অনুবাদ করার ক্ষমতা রাখেন, তিনি যে ব্যক্তিগত জয় পরাজয়কে শেষ পর্যন্ত নৈর্ব্যক্তিক আদর্শের লড়াইয়ে না নিয়ে গিয়ে ছাড়বেন না, তা বলাই বাহুল্য। মাঝে মাঝে সন্দেহ হয়, যন্ত্র-প্রযুক্তি-আধুনিতা-সভ্যতার বিরুদ্ধে তাঁর ক্ষোভ আসলে মেট্রোপলিটন রাজনীতির প্রতি তাঁর মনোভাবেরই সম্প্রসারণ মাত্র। হয়ত এটা অতিকথন হল, নিশ্চয়ই এরকম অতিসরলীকরণ বিভ্রান্তিকর। কিন্তু এইটে মানতেই হবে যে বাক্যে-ব্যবহারে-পোশাকে-জীবনদর্শনে-লক্ষ্যে-কৌশলে এবং রাজনীতিতে গান্ধীর যে প্রতিমা দেখি, তা তাঁর অব্যহিত অগ্রবর্তী মেট্রোপলিটন নেতৃত্ববৃন্দের প্রতিমাগুলির পূর্ণ অ্যান্টেথিসিস। 

গান্ধী ও বামপন্থা

 

রবীন্দ্রনাথ আক্ষেপ করেছিলেন, তাঁর কবিতা বিচিত্রপথগামী হলেও সর্বত্র যেতে পারেনি। একই আক্ষেপ গান্ধীও করতে পারতেন। বিশের দশকের সহসা বিস্তৃত রাজনীতির বিপুল পরিধির উপর গান্ধীর অসাধারণ দখল থাকলেও, স্বভাবতই সব শ্রেণী, মত ও পথকে সবসময়ের জন্য সর্বসম্মত কোন দর্শনে একত্রিত করে রাখা কারও পক্ষেই সম্ভব ছিল না, গান্ধীর পক্ষেও না। বাংলার রাজনীতির ক্ষেত্রে গান্ধীর এই ব্যর্থতা ও বর্জন আরও স্পষ্ট করে ধরা দিল। প্রথম পর্বে যখন তিনি মহানাগরিক ভদ্রলোক রাজনীতিকে বাদ দিচ্ছিলেন, তখন তাঁর আকর্ষণ এতই অপ্রতিরোধ্য ছিল যে শেষপর্যন্ত এমনকি চিত্তরঞ্জন দাশও তার রাজনীতিতে ফিরে আসেন।  কিন্তু তারপর ধরা পড়ল যে, সর্বক্ষেত্রেই এই পুর্নমিলন সম্ভব নয়।  বিপ্লবী সন্ত্রাসবীদী ঐতিহ্যে পুষ্ট যুগান্তর অনুশীলনের শিক্ষায় শিক্ষিত বাংলার তরুণের একটা স্বপ্ন ধরা পড়ল সুভাষচন্দ্র বসুর চোখে, গান্ধীর সঙ্গে তাঁর বনল না। বলশেভিক বিপ্লবের প্রেরণায় মানবেন্দ্রনাথ-মুজঃফর আহমেদের হাত ধরে বাঙালির রাজনীতির একটা বড় অংশ সাম্যবাদে দীক্ষা নিল, গান্ধীর সঙ্গে সেই মতেরও আমূল পার্থক্য। সতীনাথের ‘জাগরীতে’ এই পার্থক্যের কাহিনী আছে। তারপর দেশভাগে বিধ্বস্ত লক্ষ লক্ষ ছিন্নমূল উদ্বাস্তু বঙ্গভাষীর কাছে গান্ধী মুহূর্তে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সব ব্যর্থতার প্রতীক। উচ্চবর্গীয় ভদ্রলোক বাঙালি একদা তার সম্ভ্রান্ত ও শৌখিন অবস্থান থেকে গান্ধীকে বর্জন করেছিল, এবার নিম্নবর্গীয় পীড়িত বাঙালি তার ক্লান্ত ও পরাজিত অবস্থান থেকে গান্ধীকে পরিহার করল। গন্ধী একদিন একদল বঙ্গভাষীকে রাজনীতির কেন্দ্র থেকে প্রান্তে নিক্ষিপ্ত করেছিলেন। আরেকদল বঙ্গভাষী আরেকদিন সেই প্রান্ত থেকে গান্ধীর কেন্দ্রকে অস্বীকার করল। মহাত্মার ঘোড়াকে আটকে দেবার লোকও তো কম দেখি না। 

শুধু একটা জায়গায় গান্ধীর সঙ্গে বাংলার মতের কখনও অমিল হল না। ওই নিষ্ঠাবান হিন্দু রাজনীতিকটি ধর্মের কোনও ব্যাখ্যায় বা রাজনীতির কোনও প্ররোচনায় কখনও অস্পৃশ্যতাকে মানতে পারেননি, জাতপাতের ভেদাভেদকে গ্রহণ করতে পারেননি। বঙ্গীয় রাজনীতিও ওপর জাতপাতের প্রকট অভিশাপকে এড়িয়ে থাকতে পেরেছে। গান্ধীর সত্যের সঙ্গে বাঙালির সত্যের এবং গান্ধীর সুন্দরের সঙ্গে বাঙালির সুন্দরের অনেক দূরত্ব সত্বেও একটা নির্বিবাদ মতৈক্য পাওয়া গিয়েছে। আজকের দিনে অন্তত এইটে স্মরণ রাখা খুব জরুরি। 

আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Powered by WordPress.com.

Up ↑

%d bloggers like this: