কালিদাসী সংস্কৃত সাহিত্যে প্রকৃতি- সাহিত্যে তো সময়-সমাজ-সংস্কৃতির রসে জারিত যা প্রাচীন ভারতেরই দৃষ্টিভঙ্গী

কালিদাসী সংস্কৃত সাহিত্যে প্রকৃতি

 

মহাকবি কালিদাস কর্তৃক সংস্কৃত সাহিত্যে প্রকৃতির বর্ণনা নানাভাবে এসেছে। বিশেষ করে প্রকৃতির রূপ বৈচিত্রের অপরূপ সাহিত্যে সমৃদ্ধ। এরই মধ্যে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কটি কেমন ছিল? প্রকৃতিকে মানুষ কিভাবে দেখতো? 

প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে থাকলে প্রকৃতির প্রতি মানুষের মমত্ববোধ যে কি গভীর হয়ে ওঠে তা মহাকবি কালিদাসের ‘রঘুবংশম’ এ আমরা দেখি। শিব তার অঙ্গনের দেবদারু গাছকে সন্তানের মতো স্নেহ করেন। একদিন এক বুনোহাতির দেহের ঘর্ষণে গাছটির ছাল উঠে যাওয়ায় পার্বতীর অন্তরে হাহাকার ছড়িয়ে পড়ে। কবি কালিদাস এই হাহাকারকে অসুরদের অস্ত্রে কার্ত্তিক আহত হলে পার্বতীর অন্তরে যে শোকের ছায়া নেমে আসে তার সঙ্গে তুলনা করেছেন। এই তুলনার মধ্যে প্রকৃতির প্রতি মানুষের প্রেম এক গভীর ব্যঞ্জনায় বাঙময় হয়ে ওঠে। সন্তান বাৎসল্যে তরুলতাদের লালন করলেই এই প্রেম সম্ভব। 

‘বিক্রমোর্বশীয়ম্’ নাটকে কালিদাস বর্ণিত পুরুষরা ও ঊর্বশীর কাহিনীতে দেখি, ঊর্বশীকে নারীদের জন্য নিষিদ্ধ কুমার বনে প্রবেশ করার জন্য লতায় পরিণত হতে হলো। নারীর লতায় রূপান্তরের এই যে রূপক কোথাও যেন নারী ও লতাকে একাকার করে দেয়। লতা কেবলমাত্র বল্লরী না থেকে সে যদি কোন নারী রূপে কল্পিত হয়, স্বাভাবিক ভাবেই তার প্রতি মানুষের আচরণ পালটে যাবে। 

বৈরীতা অনেকাংশে প্রশমিত হয়ে সভ্যতার মানবিক বন্ধন প্রগাঢ় হয়। মানবিক গুনাবলীকে সূক্ষ্মতর স্তরে পৌঁছে দেওয়ার জন্য সংস্কৃত সাহিত্যে অনের নিদর্শন আছ যেমন কালিদাসের রঘুবংশম এ গর্ভবতী সীতাকে দেখে বাল্মীকি উপদেশ দিয়েছিলেন-আশ্রমের চারাগাছগুলিকে কলসিতে করে জল দিয়ে বড় করে তুলতে, এতে সে সন্তান প্রসবের আগেই শিশুকে স্তন্য পান করানোর আনন্দ অনুভব করবে। এখানে একজন নারীর মাতৃত্বকে আরো বিস্তৃত করার প্রচেষ্টা পরিলক্ষিত হয়। প্রকৃতির প্রতি আরো সহানুভূতিশীলতাই এখানে মূল উদ্দেশ্য। 

মাানুষ প্রকৃতির প্রতি এবং প্রকৃতি মানুষের প্রতি যে গভীর প্রেমে আবদ্ধ হতে পারে তার পরিচয় আমরা পাই শকুন্তলার পতিগৃহে যাত্রার প্রাক্কালে কণ্বমুনি(কাশ্যপ) তপোবনের বৃক্ষদের কাছে বিদায় নেওয়ার অনুমতি চাইলেন। গাছেদের সঙ্গে শকুন্তলার এতটাই একাত্মতা ছিল যে, তাদের জলপান না হলে শকুন্তলাও জলপান করতেন না। সে অলকার প্রিয় হয়েও গাছেদের পাতা ছিঁড়তো না, গাছে রথম ফুলটি বিকশিত হলে সে উৎফুল্ল হয়ে উঠতো। এই একাত্মতা কিন্তু একদিনে গড়ে ওঠেনি। দিনের পর দিন অসীম মমতার সঙ্গে শকুন্তলা বনের প্রতিটি জীবকে পরিচর্যা করতো, এ তারই ফলশ্রুতি। আমরা দেখি অনসূয়া শকুন্তলাকে বলছে, “এই গাছগুলি কি পিতা কাশ্যপের নিকট তোর চাইতেও অধিক প্রিয়, যে তরুমূলে জল দেওয়ার ভার পড়েছে তোরই ওপর “। প্রতিদিনের কর্মের দ্বারা প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কের আরো নিবিড় করা এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানবিক বন্ধনকে প্রগাঢ় করাই এর উদ্দেশ্য। যে হরিণশিশুর মুখের ক্ষত অসীম মমতায় শকুন্তলা সারিয়ে তোলে, সেই বারবার শকুন্তলার পথ আটকে দেয়। শকুন্তলার বিদায় লগ্নে তপোবনের পশু ও তরুসকল যে কী ভীষণ আর্দ্র হয়ে ওঠে তা প্রিয়ংবদার কথায় মূর্ত। আসন্ন বিচ্ছেদ ব্যথায় বনের হরিণেরা খাওয়া বন্ধ করে এবং লতারা যেন অনবরত চোখের জল ফেলে। 

সাহিত্যে তো সময়-সমাজ-সংস্কৃতির রসে জারিত। উপরের বর্ণনা যা প্রকৃতিকে কেন্দ্র করে মানুষের ভাবনাকে ব্যক্ত করেছে, তা প্রাচীন ভারতেরই দৃষ্টিভঙ্গী। যেখানে প্রকৃতি মানুষেরই আত্মীয় হয়ে বিধৃত। 

ব্রজেন্দ্রনাথ ধর

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Powered by WordPress.com.

Up ↑

%d bloggers like this: